বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূরাজনীতিতে নতুন সমীকরণের বার্তা দিয়ে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে শেষ হয়েছে দুই দিনব্যাপী ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন। রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) দিনভর বহুপক্ষীয় আলোচনা ও দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর সর্বসম্মতিক্রমে ‘দিল্লি ঘোষণা’ গ্রহণের মধ্য দিয়ে সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি হয়।

ভারতের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোসহ সদস্য ও সহযোগী দেশগুলোর শীর্ষ নেতারা অংশ নেন।

এবারের সম্মেলনে টেকসই ক্ষমতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা ও স্থায়িত্বকে মূল চারটি ভিত্তি হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয়। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সরবরাহব্যবস্থার সংকট ও আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যে বিশ্ব অর্থনীতির ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা এবং বহুপক্ষীয় স্থিতিশীলতা বজায় রাখার উপায় নিয়ে আলোচনা করেন নেতারা।

সম্মেলনে মোদি বলেন, বিশ্বমঞ্চে ব্রিকসকে সমন্বিত, শক্তিশালী ও কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তুলতে এই চার স্তম্ভ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

সম্মেলনের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকগুলোর মধ্যে ভারত-চীন ও ভারত-রাশিয়া বৈঠক বিশেষ গুরুত্ব পায়। দীর্ঘ সাত বছর পর ভারতীয় ভূখণ্ডে গিয়ে মোদির সঙ্গে বৈঠক করেন শি জিনপিং।

বৈঠকে হিমালয় সীমান্ত ও প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা (এলএসি) বরাবর শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেন মোদি। মতপার্থক্য যাতে বিরোধে রূপ না নেয়, সে বিষয়ে জোর দেন তিনি। সীমান্তসংক্রান্ত বিদ্যমান চুক্তি ও সমঝোতা মেনে চলার পাশাপাশি পারস্পরিক সম্মান, সংবেদনশীলতা ও স্বার্থের ভিত্তিতে এগিয়ে যাওয়ার বিষয়ে দুই নেতা একমত হন।

পুতিনের সঙ্গে পৃথক বৈঠকে মোদি মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এবং কৃষ্ণসাগর অঞ্চলের যুদ্ধ ও সংঘাত নিরসনে সামরিক আগ্রাসনের পরিবর্তে আলোচনা ও কূটনীতির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

সম্মেলনের শেষ দিনে সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদিত হয় ৪৫ পৃষ্ঠার ১৪০ অনুচ্ছেদের ‘দিল্লি ঘোষণা’। এতে বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসবাদ, সন্ত্রাসী অর্থায়ন ও একতরফা সামরিক সংঘাতের নিন্দা জানানো হয়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে গ্লোবাল সাউথের বিকাশমান ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর ন্যায্য নেতৃত্ব নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

উন্নয়নশীল দেশগুলোর অধিকার ও হিস্যা প্রতিষ্ঠায় ভারত সহযোগিতা ও কারিগরি সহায়তা দেবে বলেও প্রতিশ্রুতি দেন মোদি।

প্রযুক্তির একচ্ছত্র আধিপত্য এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদকে রাজনৈতিক চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের বিরুদ্ধেও সতর্ক করেন তিনি। এ ধরনের বৈষম্যমূলক পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও যৌথ অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করছে বলে মন্তব্য করেন মোদি।

সম্মেলন শেষে ব্রিকস নেতাদের সঙ্গে দিল্লির ‘ভারত ইনোভেটস’ প্রযুক্তি প্রদর্শনী পরিদর্শন করেন নরেন্দ্র মোদি। সেখানে উদীয়মান তরুণ উদ্ভাবকদের উৎসাহিত করেন তিনি।

২০২৭ সালে ব্রিকসের ১৯তম শীর্ষ সম্মেলন আয়োজন এবং পরবর্তী সভাপতির দায়িত্ব নিতে যাওয়া চীন ও দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে শুভেচ্ছা জানানোর মধ্য দিয়ে নয়াদিল্লি সম্মেলনের সমাপ্তি টানেন মোদি।