দেশের জ্বালানি তেলের কৌশলগত মজুত কমপক্ষে তিন মাসে উন্নীত করা, আমদানির উৎস বহুমুখীকরণ এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় অটোমেশন চালুসহ ১২ দফা সুপারিশ করেছে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় গঠিত বিশেষ সংসদীয় কমিটি।
রোববার (৭ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও বাজেট অধিবেশনের প্রথম দিনে সংসদে এ প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন কমিটির সভাপতি এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।
এর আগে বিকেল ৩টায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরু হয়।
গত ২৬ এপ্রিল জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে সাম্প্রতিক জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় করণীয় নির্ধারণে ১০ সদস্যের এই বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে ৩০ দিনের মধ্যে সুপারিশসহ প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছিল। পরে ৩ মে ও ১৯ মে কমিটির দুটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ, বিপিসি এবং পেট্রোবাংলার শীর্ষ কর্মকর্তারা সহায়তা দেন।
কমিটির ১২ দফা সুপারিশের মধ্যে রয়েছে- জ্বালানি তেলের কৌশলগত মজুত কমপক্ষে তিন মাসের সক্ষমতায় উন্নীত করা, আমদানির উৎস বহুমুখীকরণ, জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা পূর্ণাঙ্গ অটোমেশনের মাধ্যমে ডিজিটাল মনিটরিং চালু করা এবং অবৈধ মজুত ও পাচার রোধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা জোরদার করা।
এ ছাড়া বিকল্প জ্বালানি হিসেবে এলএনজি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো, ঢাকা-চট্টগ্রাম পাইপলাইন, এসপিএম প্রকল্প ও ইআরএল-২ দ্রুত বাস্তবায়ন, জনসচেতনতা জোরদার এবং বিপিসির পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জ্বালানি পণ্য আমদানির বিষয়ে সমীক্ষা করার সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে ভবনের ছাদে সোলার প্যানেল স্থাপন বাধ্যতামূলক করা এবং সেগুলো কার্যকরভাবে চলছে কি না, তা তদারকি বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে। পাশাপাশি সিস্টেম লস কমাতে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ, তেল, গ্যাস, কয়লা, সোলার ও বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদনে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং বিরোধী দলের সুপারিশগুলো প্রতিবেদনভুক্ত করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
কমিটির প্রতিবেদনে বিরোধী দলের পক্ষ থেকেও ১০টি সুপারিশ যুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি চাহিদার প্রকৃত সমীক্ষা করা, বড়পুকুরিয়াসহ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো এবং সমুদ্রে দ্রুত গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করা।
বিরোধী দলের সুপারিশে আরও বলা হয়েছে, দেশের বিভিন্ন স্থানে স্বচ্ছতার সঙ্গে তেল অনুসন্ধান অব্যাহত রাখা, ইস্টার্ন রিফাইনারির সক্ষমতা বাড়ানো, ২০৩০ সালের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ১ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে উন্নীত করা এবং সোলার প্যানেল আমদানিতে সব ধরনের কর প্রত্যাহার করা প্রয়োজন।
এ ছাড়া পার্বত্য এলাকায় মাইক্রো-হাইড্রো ও নদীপ্রবাহ ব্যবহার করে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা যাচাই, সংকটকালে সরকারি দপ্তরে গাড়ির ব্যবহার কমানো এবং হাইড্রোজেন ফুয়েল প্রযুক্তি, বায়োগ্যাস ও বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদন বিষয়ে গবেষণার সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনের উপসংহারে বিশেষ কমিটি বলেছে, সাম্প্রতিক জ্বালানি পরিস্থিতি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা কাঠামো পুনর্মূল্যায়নের একটি বড় সুযোগ তৈরি করেছে। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নীতি ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে বহুমুখী ও প্রযুক্তিনির্ভর করা সময়ের দাবি।
কমিটির মতে, কাঠামোগত সংস্কার, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সমন্বিত জাতীয় পরিকল্পনার মাধ্যমে ভবিষ্যতে শক্তিশালী, স্থিতিশীল ও টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।
মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর সভাপতিত্বে গঠিত কমিটিতে সদস্য হিসেবে ছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, হুইপ এ বি এম আশরাফ উদ্দিন, হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু, সংসদ সদস্য মঈনুল ইসলাম খান, মো. সাইফুল আলম, মো. নূরুল ইসলাম, মো. আব্দুল বাতেন, মো. আবুল হাসনাত ও মোহাম্মদ আবুল হাসান।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। আপনিই প্রথম মন্তব্য করুন!
আপনার মতামত দিন