প্রিন্ট এর তারিখঃ Mar 2, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ Feb 15, 2026 ইং
স্মৃতির মেঘলাভোরে আল মাহমুদ: কবির মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শক্তিমান কবি আল মাহমুদের তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী আজ। কবির এপিটাফে খোদাই করা তাঁরই কবিতার পঙ্ক্তি—‘কোনো এক ভোরবেলা, রাত্রিশেষে শুভ শুক্রবারে,মৃত্যুর ফেরেস্তা এসে যদি দেয় যাওয়ার তাকিদ; অপ্রস্তুত এলোমেলো এ গৃহের আলো অন্ধকারে, ভালোমন্দ যা ঘটুক মেনে নেবো এ আমার ঈদ’— যেন তাঁর জীবন ও মৃত্যুর অনিবার্য মিলনকে আগেই ইঙ্গিত দিয়েছিল। তিনিও বিদায় নেন এক শুক্রবারে। এই দিনে কবিকে স্মরণ করে পাঠক-অনুরাগীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করছেন তাঁর কবরের সেই ছবি, স্মৃতিচারণ করছেন তাঁর কবিতা ও কথাসাহিত্যের।
২০১৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন কবি আল মাহমুদ। তাঁর পূর্ণ নাম মীর আবদুস শুকুর আল মাহমুদ। জন্ম ১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার মোড়াইল গ্রামে। পিতা মীর আবদুর রব এবং মাতা রওশন আরা মীর।
শিক্ষাজীবনে তিনি কুমিল্লার দাউদকান্দি থানার সাধনা হাই স্কুল ও পরে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড হাই স্কুলে পড়াশোনা করেন। এই সময় থেকেই তাঁর সাহিত্যচর্চার সূচনা। ১৯৫৪ সালে সাংবাদিকতার সূত্র ধরে ঢাকায় এসে কবি আব্দুর রশীদ ওয়াসেকপুরী সম্পাদিত সাপ্তাহিক কাফেলায় লেখালেখি শুরু করেন। পাশাপাশি দৈনিক মিল্লাত পত্রিকায় প্রুফ রিডার হিসেবে যুক্ত হয়ে সাংবাদিকতা জগতে পদচারণা করেন।
মুক্তিযুদ্ধের পর তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় দৈনিক গণকণ্ঠ। এ সময় রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাঁকে এক বছর কারাবন্দী থাকতে হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৭৫ সালে শিল্পকলা একাডেমির গবেষণা ও প্রকাশনা বিভাগের সহপরিচালক এবং পরে পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৩ সালে সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেন।
কাব্যগ্রন্থ লোক লোকান্তর (১৯৬৩) ও কালের কলস (১৯৬৬) তাঁকে পাঠকসমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত করে। এ দুই গ্রন্থের জন্য ১৯৬৮ সালে তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৭৩ সালে প্রকাশিত সোনালী কাবিন বাংলা কবিতার ইতিহাসে এক অনন্য সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হয়।
মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি গল্প ও উপন্যাস রচনায় মনোযোগ দেন। পানকৌড়ির রক্ত, কবি ও কোলাহল, বখতিয়ারের ঘোড়া, মিথ্যাবাদী রাখাল, কাবিলের বোন, ডাহুকিসহ বহু গ্রন্থে তিনি তুলে ধরেছেন সমাজ, ইতিহাস ও মানুষের অন্তর্লোক। তাঁর আত্মজীবনী যেভাবে বেড়ে উঠি বাংলা সাহিত্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। ছড়া রচনাতেও তিনি ছিলেন স্বতন্ত্র ও প্রভাবশালী।
সাহিত্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ আল মাহমুদ পেয়েছেন একুশে পদক, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, জয় বাংলা পুরস্কার, কবি জসীমউদ্দীন পুরস্কারসহ অসংখ্য সম্মাননা।
জীবনের শেষ প্রান্তে এসে বিতর্ক ও বৈপরীত্য তাঁকে ঘিরে ধরলেও পাঠকের কাছে আল মাহমুদ আজও বহমান— কবিতায়, কথায়, স্মৃতিতে। আজ মৃত্যুবার্ষিকীতে কবির প্রতি শ্রদ্ধা শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের এক শক্তিশালী উত্তরাধিকারকে স্মরণ করার দিন।
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ বাংলাদেশ ২৪৭