
বিএনপির নবনির্বাচিতরা সংসদ সদস্যের শপথ নিলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির বিজয়ীরা দুই শপথই নিয়েছেন।
দুই শপথ নিয়ে আলোচনা সামনে রেখে জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের কেউ বলেছেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে শপথের বিষয়টি যুক্ত করা 'বেআইনি'।
কেউ মনে করছেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ না নেওয়া বিএনপির 'অহেতুক সতর্কতা'। মঙ্গলবার প্রথমে নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া দল বিএনপির সদস্যরা শপথ নেন। এরপর ক্রমানুসারে জামায়াত ও এনসিপির সদস্যরা শপথ নেন।
বিএনপির সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ার বিষয়ে শপথ অনুষ্ঠান শুরুর আগে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ সিদ্ধান্ত জানান।
হাতে ফর্ম দেখিয়ে তিনি বলেন, ''আমরা কেউ সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে নির্বাচিত হইনি এবং সংবিধানে এটা এখনও ধারণ করা হয়নি। গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হলে সেটা সংবিধানে আগে ধারণ করতে হবে এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যকে কে শপথ নেওয়াবেন, সেটা বিধান করতে হবে এবং কোনো এরকম ফর্ম-এটা সংবিধানে নেই।
''এই ফর্মটি তৃতীয় তফসিলে আছে, সাদাটা। এই রকম তখন একটা ফর্ম সংবিধানের তৃতীয় তফসিলে আসবে। সেগুলো সাংবিধানিকভাবে জাতীয় সংসদে গৃহীত হওয়ার পরে তখন জাতীয় সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের শপথ নেওয়ার বিধান করা যাবে বিধায় আমরা এখন সাংবিধানিকভাবে এই পর্যন্ত আমরা এসেছি।'' দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
সালাউদ্দিন আহমদ বলেন, বিএনপি সংবিধান মেনে চলছে এবং আগামী দিনেও চলবে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলছেন, রাষ্ট্রপতির আদেশের মাধ্যমে যেভাবে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি করা হয়েছে, যেভাবে তাতে সংবিধান সংশোধন পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথের বিষয় যুক্ত করা হয়েছে, তা ‘বেআইনি’।
তিনি প্রশ্ন রেখেছেন, ''সংবিধানকে আপনি আলাদা আরেকটা আদেশ দিয়ে কি সাবস্টিটিউট করতে পারবেন?''
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই এক সঙ্গে গণভোট আয়োজনের সময় দিয়ে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি করা হয় গেল ১৩ নভেম্বর।
দীর্ঘ এক বছরের আলোচনা, সংলাপ ও তর্কবিতর্কের পর রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্যোগগুলো নিয়ে জাতীয় সনদ চূড়ান্ত করাহয়, যা স্বাক্ষর হয় গেল ১৭ অক্টোবর।
সনদের সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত ৪৮টি বিষয়ে চার প্রশ্নে 'হ্যাঁ/না' ভোটের মাধ্যমে ভোটারদের সম্মতি নেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ২০৯ আসনে জয়লাভ করে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করছে। জামায়াত ৬৮ ও এনসিপি ৬ আসনে জয় পেয়েছে। গণভোটে ৬০ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ ভোট পেড়ে ‘হ্যাঁ’তে।
বিএনপি সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেব কি না এ আলোচনার মধ্যে সোমবার রাতে যমুনা টিভির এক আলোচনা অনুষ্ঠানে জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, গণভোটে 'হ্যাঁ' ভোট জয় পাওয়ার পর আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়, নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের আলাদাভাবে দুটো শপথ নেওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে। কিন্তু ব্যাখ্যা করলে বোঝা যায়, বিষয়টি অন্যরকম।
''এটা কোনোরকম ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ছাড়া জাস্ট মেনে নেওয়ার মত কোনো বিষয় না। খুব বেআইনিভাবে কিছু কাজ হয়েছে। দ্বিতীয় আরেকটি শপথের বিষয় যুক্ত করা হয়েছে, যেটার আসলে কোনো এখতিয়ারই নেই।''
বিষয়টি ব্যাখ্যা করে এই আইনজীবী বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পুরোটা সময়ে অনেকগুলো আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। সেগুলো কার্যকর করা হয়েছে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে।
''কিন্তু জুলাই সনদ সই হওয়ার পরে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ বলে একটি আদেশ পরে দেওয়া হয়েছে যেটা রাষ্ট্রপতির একমাত্র আদেশ, যেটা ১৩ নভেম্বর ২০২৫ এ উনি (রাষ্ট্রপতি) আদেশ দিলেন। এখন এই যে আদেশটা দিলেন, এই আদেশ দেওয়ার আসলে রাষ্ট্রপতির কোনো এক্তিয়ার আছে কিনা?''
সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদে তিনটি সুনির্দিষ্ট শর্ত থাকার কথা তুলে ধরে এই আইনজীবী বলেন, ''তার প্রথম একটাই হচ্ছে যে এটা বিদ্যমান সংবিধানের এমন কোনো বিষয় বলছে যে 'তবে শর্ত থাকে যে' অর্থাৎ সংসদ নেই এমন কোনো বিশেষ মুহূর্ত বা পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে এরকম অধ্যাদেশ পাস করতে হচ্ছে। কিন্তু তিনি তিনটি জিনিসের কারণে করবেন না, কন্ডিশনটা কী?

''যাহা এই সংবিধানের অধীনে সংসদে আইনের দ্বারা আইনসম্মতভাবে করা যায় না এরকম কোনো অধ্যাদেশ পাস করতে পারবেন না।
যাহাতে এই সংবিধানের কোনো বিধান পরিবর্তিত বা রহিত হইয়া যায়। অর্থাৎ বিদ্যমান সংবিধানের কোনো বিধান পরিবর্তিত বা রহিত হইয়া যায় সেরকমের কোনো অধ্যাদেশই ওনার দেওয়ার এক্তিয়ার নাই, তো উনি আদেশ দিবেন কোত্থেকে? আর এই ৯৩ অনুচ্ছেদের মধ্যে তো আদেশ দেওয়ার মতো কোনো এক্তিয়ারও ওনাকে রাখা হয়নি, যেটা সংবিধানের মৌলিক পরিবর্তন করে ফেলবে।''
তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি যে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি করেছে সে আদেশের সবশেষে তফসিল-১ এ আরেকটি শপথ যুক্ত করা হয়েছে।
"কন্সটিটিউশনকে আপনি আলাদা আরেকটা অর্ডার দিয়ে কি সাবস্টিটিউট করতে পারবেন?
সংসদ সদস্যদের শপথ বিষয়ে সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদের কথা তুলে ধরে জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, সে অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংবিধানের তৃতীয় তফসিলে যে শপথের নমুনাগুলো দেওয়া আছে সে অনুযায়ী এই শপথ পাঠ হবে।
"এই সংবিধানের ভেতরে আপনি অর্ডারের মাধ্যমে সংবিধানের মৌলিক পরিবর্তন করে শপথ ঢুকাবেন? এটা কোন আইনে পেলেন আপনারা?
সংবিধান বিদ্যমান আছে কি না, এ বিষয়ে তিনি বলেন, "এই জায়গাতেও আপত্তির জায়গা আছে। ওটাকে আমি একটু উদাহরণ দিয়ে বোঝাচ্ছি।
কিন্তু আমি এখানে যেটা বলতে চাইছি যে মেম্বার অব পার্লামেন্ট থেকে শুরু করে যে শপথগুলো আছে, এই শপথের বাইরে যদি আপনাকে সাপ্লিমেন্ট করতে হয় তাহলে তো আসলে এখানে শপথের বিষয়টা থাকতে হবে, না হলে এই সংবিধানের অধীনে তো আর শপথ নিচ্ছেন না আপনারা।
"যখন আপনি ১৪৮ এর উপধারা ২ এর ক উপ-অনুচ্ছেদ ২ এর ক, এই অনুযায়ী যখন প্রধান নির্বাচন কমিশনার শপথ পড়াচ্ছেন তখন কিন্তু এই বিদ্যমান কন্সটিটিউশনেই।
তাহলে কি দুই শপথ অপরিহার্য নয়? এ নিয়ে এই জ্যেষ্ঠ আইনজীবী বলেন, "আমি তো এই পার্টিকুলার এই আদেশটার কোনো লিগ্যালিটিই পাই নাই। এটা তো আইনগতভাবে উনার পাস করারই কোনো এক্তিয়ার ছিল না।
এই অর্ডারটাই হচ্ছে ইলিগ্যাল। মানে দ্বিতীয় শপথের কথা যেটা আসছে যে জুলাই জাতীয় সনদ সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ। এই আদেশটাই তো অবৈধ আদেশ। এই আদেশটাই তো আইনগতভাবে টিকবে না। ওনার তো এক্তিয়ার নেই সংবিধানের মৌলিক পরিবর্তন করে ফেলার।
"প্লাস, আরেকটা যেটা করেছেন উনারা। উনারা নির্বাচিত একটি সংসদকে বাধ্য করছেন। আপনি এই একটা ধরেন, এখন একটা সংসদ আছে, তাদের কোনো কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে পরবর্তী সংসদকে কি বাধ্য করা যায়? কোনো সুযোগই নেই আপনি বাধ্য করার। কারণ তাতে তো পার্লামেন্টারি সভারেন্টির পুরো আইডিয়াটাই নষ্ট হয়ে যায়।
ওটা তো আর থাকে না। সংসদের যে সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন আছে সেটাই তো আপনি প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছেন যখন আপনি ডিক্টেট করছেন যে আপনারা এটা করবেন ওটা করবেন।"
১৯৯১ সালের গণভোট প্রসঙ্গ ধরে তিনি বলেন, "তখন তো এরকম দুইটা শপথের কোনো ব্যাপারই ছিল না।
এবার দুইটা শপথের প্রশ্ন আসছে তো হচ্ছে জুলাই চার্টার আলাদাভাবে চার্টার হয়েছে সেজন্য। সেই কারণেই এই দ্বিতীয় শপথের প্রশ্ন আসছে।
ওই সময়টা যেটা হয়েছে আপনার প্রেসিডেন্সিয়াল ফর্ম অব গভর্নমেন্ট, সেখান থেকে আপনি ট্রানজিশনের মধ্যে আপনি পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছেন হচ্ছে পার্লামেন্টারি ফর্ম অব গভর্নমেন্টে।
"ডিসিশনটা মেইক করেছে কে? ডিসিশন মেইক করেছে কিন্তু এদেশের মানুষ। এদেশের মানুষ ভোট দিয়ে বলেছে যে আমরা পার্লামেন্টারি ফর্ম অব গভর্নমেন্ট চাই। কিন্তু এখন তো আপনার ওই কাউন্সিল, আমার হয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে সেজন্য হ্যাঁ না ভোট নিলেন আপনি। আমি তো এই কন্সটিটিউশনের সমস্ত যে চেঞ্জেসগুলো হবে সেখানে তো আমি কোনো ম্যান্ডেট দিই নাই।
"আমি তো হ্যাঁ-র যদি ম্যান্ডেট দিই, ম্যান্ডেট দিলাম কিন্তু হচ্ছে ওই কাউন্সিল যারা বসবে সে কাউন্সিল ১৮০ দিনে কন্সটিটিউশন পরিবর্তন করে ফেলতে পারবে সেজন্য। এটা বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ বুঝেছে কিনা এতে তো আমার সন্দেহ আছে।"
আরেকজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী বলছেন, বিএনপি গণভোটের অধ্যাদেশসহ সব অধ্যাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন দিতে চায়। তারপরে দলটির সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিতে চান।
তিনি মনে করেন, একসঙ্গে দুই শপথ না নেওয়া বিএনপির 'অহেতুক সতর্কতা,' কারণ (গণভোটে) জনগণ স্পষ্টভাবে তাদের মত দিয়েছে। তবে বিএনপির সন্দেহ দূর করার চেষ্টায় দোষ দেখছেন না এই আইনজীবী।