
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উঠে এসেছে দেশের মন্থর অর্থনীতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্ব। সাম্প্রতিক সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ের পর এসব ইস্যুতেই জনগণ নতুন সরকারকে সবচেয়ে বেশি বিচার করবে বলে মত দিয়েছেন বিশ্লেষকরা।
সম্প্রতি একটি ওয়েবিনারে অংশ নেওয়া বক্তারা বলেন, শান্তিপূর্ণ নির্বাচন প্রশংসনীয় হলেও নতুন সরকারের মূল পরীক্ষা হবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখা।
ওয়েবিনারে বক্তব্য রাখতে গিয়ে কাউন্টারপয়েন্টের সম্পাদক জাফর সোবহান বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা–এর পতনের পেছনে অর্থনৈতিক অসন্তোষ বড় ভূমিকা রেখেছিল। তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে না পারলে সরকারের ‘হানিমুন পিরিয়ড’ বেশি দিন স্থায়ী হবে না বলেও তিনি সতর্ক করেন।
এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউট আয়োজিত ‘Bangladesh After the Vote: Democracy, Reform and Foreign Policy Outlook’ শীর্ষক সেমিনারে জাফর সোবহান আরও বলেন, আর্থিক স্থিতিশীলতা জোরদারে নতুন সরকারকে মুদ্রা স্থিতিশীল করা এবং খেলাপি ঋণের হার কমানোর দিকে গুরুত্ব দিতে হবে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ৩০০ আসনের মধ্যে ২০৯টি আসনে জয়লাভ করে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৭৭টি আসন। ২০২৪ সালে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর এটিই ছিল বাংলাদেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচন।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ( International Monetary Fund ) জানিয়েছে, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৭ শতাংশে, যা আগের বছরের তুলনায় কম। তবে চলতি ও পরবর্তী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৭ শতাংশে উন্নীত হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি।
বিশ্লেষকরা জানান, আগের কয়েক দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতি বছরে ৬ থেকে ৭ শতাংশ হারে বাড়লেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধসহ বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক সংকট ও বিশ্ব অর্থনীতির মন্দার প্রভাবে প্রবৃদ্ধি কমে এসেছে।
ওয়েবিনারে অংশ নেওয়া বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নতুন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী খালিলুর রহমানের অভিজ্ঞতা কঠিন সময় পার করতে সহায়ক হবে। সাবেক কূটনীতিক শহীদ আখতার বলেন, নতুন মন্ত্রিসভায় অভিজ্ঞ ও তরুণ প্রজন্মের সমন্বয় স্পষ্ট, যা মেধাভিত্তিক নেতৃত্বের ইঙ্গিত দেয়।
এদিকে আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থা Moody’s Ratings সতর্ক করে বলেছে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এখনও পুরোপুরি ফিরেনি। পোশাক খাতে বিচ্ছিন্ন অস্থিরতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রভাব ফেলছে। তবে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন জোরদার ও বিনিময় হার আরও নমনীয় করার উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখেছে সংস্থাটি।
অন্যদিকে Oxford Economics জানিয়েছে, বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের ফলে বাণিজ্য সুবিধা হারালে রপ্তানি আয়ে প্রায় ১৪ শতাংশ পতনের ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষ করে পোশাক খাতে ভিয়েতনাম ও ভারতের সঙ্গে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বিশ্লেষকরা মনে করেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে পদক্ষেপ নিতে পারেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, দুই দেশের সহযোগিতা জোরদার হলে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।
তথ্যসূত্র: সাউথ চাইনা মর্নিং পোস্ট