
দীর্ঘদিন ধরেই ইরানে সামরিক হামলা চালিয়ে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যা এবং ইসলামি শাসকগোষ্ঠীকে ক্ষমতাচ্যুত করতে যুক্তরাষ্ট্রকে প্ররোচিত করে আসছিল সৌদি আরব। এই প্রচেষ্টায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। অবশেষে শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে। প্রাণঘাতী ওই হামলায় প্রায় চার দশক ধরে ক্ষমতায় থাকা ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন।
ওয়াশিংটন পোস্ট-এর এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানে হামলার নীতিনির্ধারণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্তত চারটি সূত্রের বরাতে জানা গেছে- মধ্যপ্রাচ্যের দুই ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েল ও সৌদি আরবের কয়েক সপ্তাহের লাগাতার লবিংয়ের পরই এই হামলার সিদ্ধান্ত নেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গত জানুয়ারিতে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান একাধিকবার ব্যক্তিগতভাবে ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। প্রকাশ্যে কূটনৈতিক সমাধানের কথা বললেও আড়ালে তিনি ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য চাপ দিয়ে আসছিলেন। একই সময়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানকে ইসরায়েলের ‘অস্তিত্বের জন্য হুমকি’ আখ্যা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে হামলার জন্য প্ররোচিত করেন। দুই নেতার যৌথ চাপের মুখে ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে অভিযানের নির্দেশ দেন ট্রাম্প।
হামলার শুরুতেই আয়াতুল্লাহ খামেনিসহ ইরানের বেশ কয়েকজন শীর্ষ সামরিক ও সরকারি কর্মকর্তা নিহত হন। পারমাণবিক আলোচনা স্থবির হয়ে পড়া এবং ইরান পুনরায় পারমাণবিক কার্যক্রম শুরু করেছে—এমন অভিযোগের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের সামরিক ও সরকারি স্থাপনায় একযোগে হামলা চালায়।
ট্রাম্প জানান, ‘এই তীব্র ও নিখুঁত বোমা হামলা প্রয়োজনে সপ্তাহজুড়ে বা তারও বেশি সময় ধরে চলতে পারে।’ যদিও মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মূল্যায়নে বলা হয়েছিল, আগামী এক দশকেও ইরানি বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডের জন্য বড় কোনো হুমকি নয়। তবুও এই অভিযানকে ট্রাম্প প্রশাসনের আগের সামরিক নীতির তুলনায় একটি বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
হামলার জবাবে ইরান সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবি ও দুবাই, কাতারের দোহা এবং সৌদি আরবের রিয়াদে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। এতে মধ্যপ্রাচ্য নতুন করে একটি বিস্তৃত সংঘাতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে ইরানের পাল্টা হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছে, ‘এই নগ্ন ও কাপুরুষোচিত হামলার কোনো অজুহাত বা যৌক্তিকতা নেই।’ একই সঙ্গে তারা দাবি করেছে, ইরানের বিরুদ্ধে কোনো হামলায় সৌদি আরব তাদের আকাশসীমা বা ভূখণ্ড ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি।
এদিকে হামলা চলাকালেই এক ভিডিও বার্তায় ট্রাম্প ইরানিদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমি আজ রাতে যা করেছি, তা কোনো প্রেসিডেন্ট করতে রাজি ছিলেন না। এখন এমন একজন প্রেসিডেন্ট আছেন, যিনি আপনাদের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাচ্ছেন। দেখা যাক, আপনারা কীভাবে সাড়া দেন।’
হামলার কয়েক দিন আগেও ট্রাম্পের দূত স্টিভ উইটকফ এবং জামাতা জ্যারেড কুশনার ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। ওই সময় সৌদি আরব বিবৃতি দিয়ে জানায়, সৌদি যুবরাজ ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের মধ্যে ফোনালাপ হয়েছে এবং সৌদি আরব কোনো হামলায় তাদের ভূখণ্ড ব্যবহারের অনুমতি দেবে না।
ওয়াশিংটন পোস্ট-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি যুবরাজের এই দ্বৈত অবস্থান মূলত একদিকে তেল অবকাঠামো রক্ষা এবং অন্যদিকে তেহরানকে রিয়াদের ‘চরম শত্রু’ হিসেবে দেখার কৌশলের ফল। শিয়া-প্রধান ইরান ও সুন্নি নেতৃত্বাধীন সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের বিরোধের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলে একাধিক প্রক্সি যুদ্ধ হয়েছে।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বড় ধরনের হামলায় খামেনির মৃত্যুর বিষয়টি রোববার ভোরে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ও বার্তা সংস্থা ইরনা নিশ্চিত করে। ট্রাম্প বলেন, ‘এটি ইরানিদের জন্য তাদের দেশ ফিরিয়ে পাওয়ার সুযোগ।’
এরই মধ্যে পাল্টা আক্রমণ ও প্রতিশোধ নেওয়ার হুমকি দিয়েছে ইরানের আধাসামরিক বাহিনী রেভল্যুশনারি গার্ড। তারা ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা চালানোর ঘোষণা দিয়েছে।
দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা খামেনির মৃত্যুতে ইরানে নেতৃত্বশূন্যতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তাঁর কোনো উত্তরসূরি নির্ধারিত না থাকায় দেশটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পথ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।