
রাজধানীতে কূটনীতিকদের সম্মানে আয়োজিত এক ইফতার মাহফিলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহযোগিতা ও আস্থার ভিত্তিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি বলেন, বাংলাদেশ সব সময় দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সম্পর্ককে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে থাকে এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে সমৃদ্ধি অর্জনের পথেই সরকার এগিয়ে যেতে চায়।
গতকাল শুক্রবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় আয়োজিত ওই ইফতার মাহফিলে ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও বিদেশি মিশনের প্রতিনিধিরা, মন্ত্রিসভার সদস্য এবং সংসদ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে এসব তথ্য জানান।
ইফতারের আগে দেওয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই আয়োজন কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি বিভিন্ন জাতি, ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষের পারস্পরিক সম্মান, সহমর্মিতা এবং ঐক্যের গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়। তিনি বলেন, সহযোগিতা ও সম্পৃক্ততার মাধ্যমেই টেকসই উন্নয়ন সম্ভব, বিচ্ছিন্নতার মাধ্যমে নয়।
প্রধানমন্ত্রী জানান, সরকার বিচক্ষণ নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ নীতি অনুসরণ করবে এবং ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ আরও সহজ করার উদ্যোগ নেবে। একই সঙ্গে দায়িত্বশীল বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য একটি প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ গড়ে তোলার কথাও তিনি উল্লেখ করেন। তার মতে, দেশের জনগণ ও বেসরকারি খাতের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানোই সরকারের অন্যতম লক্ষ্য।
পররাষ্ট্রনীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পারস্পরিক স্বার্থ, আস্থা ও সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব’ নীতির আলোকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি হবে বাস্তববাদী ও টেকসই। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় অংশীদারিত্বকে মূল্যায়ন করে এবং ভবিষ্যতেও উন্মুক্ত আলোচনা ও শক্তিশালী সহযোগিতার জন্য প্রস্তুত থাকবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করা, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং সমাজের সব স্তরে দক্ষতা উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মানবসম্পদ গড়ে তোলার ওপর সরকার গুরুত্ব দেবে। উদার অর্থনৈতিক নীতির মাধ্যমে উদ্যোগ ও উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করা হবে এবং প্রবৃদ্ধির ভিত্তি হিসেবে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব আরও জোরদার করা হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগের সন্ধিক্ষণে রয়েছে। দেশের তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নারীর ক্ষমতায়ন, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর ও টেকসই অর্থনীতি গড়ে তোলাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য।
প্রধানমন্ত্রী আরও জানান, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা জোরদার করা, পাঠ্যক্রমে তৃতীয় ভাষা অন্তর্ভুক্ত করা এবং গ্রামীণ এলাকায় প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে উন্নয়নের সুফল দেশের প্রতিটি প্রান্তে পৌঁছে যায়।
তিনি বলেন, জনগণের আস্থা অর্জনের জন্য স্বচ্ছতা ও সততা অপরিহার্য। তাই শাসনের সব স্তরে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গণতন্ত্রকে শুধু ভোটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না রেখে অন্তর্ভুক্তি, স্বচ্ছতা ও সংলাপের ধারাবাহিক প্রক্রিয়া হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
তারেক রহমান বলেন, সরকার গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা, আইনের শাসন বজায় রাখা, স্বাধীনতা রক্ষা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। পাশাপাশি মানবাধিকার সুরক্ষা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সহনশীলতা ও বহুত্ববাদের সংস্কৃতি গড়ে তুলতেও সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী জানান, সরকারের উদ্যোগে ধাপে ধাপে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড চালু করা হবে, যাতে পরিবার ও কৃষি সম্প্রদায়ের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা নিশ্চিত করা যায়।
পরিবেশ ও জলবায়ু প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশ জলবায়ু সহনশীলতা ও টেকসই উন্নয়ন এগিয়ে নিতে বৈশ্বিক অংশীদারদের সঙ্গে গঠনমূলকভাবে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
এ সময় প্রধানমন্ত্রী ২০২৬–২৭ মেয়াদের জন্য জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির পদে বাংলাদেশের প্রার্থী হিসেবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানকে সমর্থনের আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বক্তব্য রাখেন।