
গাজীপুরে ঝুট দখলকে কেন্দ্র করে বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষের ঘটনায় চাঞ্চল্যকর এক তথ্য পাওয়া গেছে।
গত শনিবার (৭ মার্চ) ম্যানাল ফ্যাশন কারখানাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের সময় ককটেল বিস্ফোরণ, গুলিবর্ষণ, ধাওয়া–পাল্টা ধাওয়া এবং মোটরসাইকেলে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। তবে এতে কেউ হতাহত হয়নি।
অভিযোগ উঠেছে, কারখানার মালিক রাশিদুল হাসান চাঁদ নিজ স্বার্থে বিএনপির প্রতিদ্বন্দ্বী দুই পক্ষকে ব্যবহার করছেন। একই সঙ্গে স্থানীয় আওয়ামী লীগকে আর্থিক সুবিধা পৌঁছে দিতেও তিনি পরোক্ষভাবে ভূমিকা রাখছেন বলে বিভিন্ন সূত্র দাবি করেছে।
জানা গেছে, ম্যানাল ফ্যাশনের মালিক রাশিদুল হাসান চাঁদের বাড়ি চাঁদপুরে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি প্রভাবশালী ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মান্নান কচির ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিতি পান। মান্নান কচি যখন বিজিএমইএর সভাপতি নির্বাচিত হন, তখন তার পেছনে অন্যতম সমর্থক ছিলেন রাশিদুল হাসান চাঁদ।
বিজিএমইএর একাধিক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কচির প্রভাবে রাশিদুল চাঁদ দীর্ঘদিন ধরেই প্রভাব বিস্তার করে আসছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি নিজেকে সাধারণ ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচয় দিলেও তার পুরনো রাজনৈতিক যোগাযোগ এখনও সক্রিয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
আরেক ব্যবসায়ী জানান, ম্যানাল ফ্যাশনে ঝুট ব্যবসা নিয়ে বিএনপির দুই গ্রুপের দ্বন্দ্বের পেছনে মূলত মালিকপক্ষের কারসাজি রয়েছে।
শিল্প পুলিশের একটি গোপন তালিকা অনুযায়ী, গাজীপুর মহানগরের প্রায় ৮০ শতাংশ কারখানার মালিক আওয়ামী লীগ সমর্থক। অভিযোগ রয়েছে, এসব কারখানার অনেক মালিক এখনও গোপনে আওয়ামী লীগকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করছেন। সেই তালিকায় রাশিদুল হাসান চাঁদের নামও রয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, ম্যানাল ফ্যাশন কারখানার ঝুট ব্যবসা দীর্ঘদিন ধরে নিয়ন্ত্রণ করতেন স্থানীয় সন্ত্রাসী মিনহাজ গ্রুপ। মিনহাজ ১৪ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এবং গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি রিপন সরকারের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত।
পট পরিবর্তনের পর মিনহাজ ও তার সহযোগীরা আত্মগোপনে গেলেও ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ছাড়েনি। অভিযোগ রয়েছে, গার্মেন্টস মালিক রাশিদুল হাসান চাঁদের সহায়তায় মিনহাজের দুই স্বজন বকুল ও হাতেমের মাধ্যমে ঝুট নামানো অব্যাহত ছিল।
বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা এতে আপত্তি জানান এবং মালিকপক্ষের সঙ্গে কয়েক দফা আলোচনা করেন। মালিকপক্ষ আশ্বাস দিলেও শেষ পর্যন্ত সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি বলে অভিযোগ।
গত বছরের ফেব্রুয়ারিতেও একই ঘটনায় সংঘর্ষ হয়। সে সময় থানা বিএনপির সভাপতি তানভীর সিরাজের অনুসারীরা ঝুট নামাতে গেলে স্থানীয় বিএনপি বাধা দেয়। ওই ঘটনায় বাসন থানায় দুটি মামলা হয়।
এরপর প্রায় এক বছর পরিস্থিতি শান্ত থাকলেও অভিযোগ রয়েছে, মালিকপক্ষ আবারও পুরনো চক্রকে ঝুট ব্যবসার সুযোগ দেয়। সেই আয়ের একটি অংশ মিনহাজ ও তার সহযোগীদের কাছে পৌঁছাত বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
পরবর্তীতে বিষয়টি আবারও প্রকাশ্যে এলে স্থানীয় বিএনপি মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করে। তখন তাদের ঝুট নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হলেও গোপনে পুরনো চক্রের হয়ে নতুন একটি গ্রুপকে সামনে আনা হয়।
এই গ্রুপের নেতৃত্বে ছিলেন কৌশিক খান ও শরীফ আজাদ। গত ৭ মার্চ একই দিনে উভয় পক্ষকে ঝুট নামাতে বলা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ সময় সশস্ত্র অবস্থায় ঝুট নিতে এলে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ বাধা দেয়। সেখান থেকেই সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। সংঘর্ষে ককটেল বিস্ফোরণ, গুলিবর্ষণ এবং একটি মোটরসাইকেলে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় বিএনপির পক্ষে ১৪ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সভাপতি নাজমুল এক ভিডিও বার্তায় বলেন, দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় বিএনপির ৭০–৮০ জন কর্মী এই ঝুট ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন।
তার অভিযোগ, বিএনপি পরিচয়ধারী কৌশিক, শরীফ আজাদ, আশিক ও বরিশাইল্যা মান্নানের নেতৃত্বে সন্ত্রাসী নিয়ে হামলা চালানো হয়।
তিনি বলেন, তারা জোরপূর্বক ঝুট নিতে চাইলে এলাকাবাসী প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এ সময় তারা ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়, গুলি চালায় এবং একটি মোটরসাইকেলে আগুন দেয়।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুর রহিম বলেন, এলাকার নির্যাতিত ও বঞ্চিত বিএনপির লোকজনই এই ব্যবসার প্রকৃত দাবিদার। কিন্তু কৌশিক ও শরীফ আজাদ সন্ত্রাসী কায়দায় দখল নিতে চাইছে। এর পেছনে কারখানা মালিকের সমর্থন রয়েছে।
অন্যদিকে কৌশিক খান দাবি করেন, তারা ঝুট নামাতে গেলে স্থানীয় বিএনপি নেতা সিরাজ, রফিক ও নাজমুলের নেতৃত্বে তাদের ওপর হামলা চালানো হয় এবং মালামাল ছিনিয়ে নেওয়া হয়।
তার দাবি, হামলার সময় স্থানীয়রা গুলি ও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়।
কে এই কৌশিক খান
তথ্য অনুযায়ী, কৌশিক খানের বাড়ি কিশোরগঞ্জে। তিনি গাজীপুর মহানগরের দিঘীরচালা এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকেন। দখল, মারামারি ও ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে একাধিকবার আলোচনায় এসেছেন তিনি।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, তার ক্ষমতার অন্যতম উৎস ছিলেন পলাতক পুলিশ কর্মকর্তা হারুনুর রশিদ। গাজীপুরে পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে হারুনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে কৌশিকের। সেই প্রভাব ব্যবহার করে দীর্ঘদিন বিভিন্ন ব্যবসা ও দখল কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অনেকের দাবি, ওই সময় ব্যবসায়ী ও ঝুট ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের কাছ থেকে অর্থ আদায়েও তিনি প্রভাব খাটাতেন। গাজীপুরে দীর্ঘ সময় প্রভাব বিস্তার করলেও এখনও পর্যন্ত তিনি স্থায়ীভাবে কোনো বাড়ি বা ফ্ল্যাট কেনেননি।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় গাজীপুরে তার ব্যাপক প্রভাব ছিল বলে স্থানীয়রা দাবি করেন। অনেকেই তাকে তৎকালীন ডিবি কর্মকর্তা হারুনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী বা “ক্যাশিয়ার” বলেও উল্লেখ করেন।
রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর কৌশিক নিজেকে বিএনপি নেতা হিসেবে পরিচয় দিতে শুরু করেন এবং বিভিন্ন স্থানে পোস্টার সাঁটান। তিনি নিজেকে গাজীপুর মহানগর জাসাসের সদস্য সচিব বলেও দাবি করেন।
তবে ম্যানাল ফ্যাশন কারখানার ঝুট দখল করতে গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রতিরোধের মুখে পড়েন তিনি। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, এ সময় কৌশিক ও তার সহযোগীরা ককটেল বিস্ফোরণ ও গুলিবর্ষণ করে এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করে।
এ নিয়ে স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা বলেন, জীবন দেব, তবু বহিরাগত কাউকে ব্যবসা করতে দেব না।