
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর হুঁশিয়ারির মধ্যেও ইরানের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে কয়েকটি দেশের জাহাজ হরমুজ প্রণালী ব্যবহার করছে। ফলে বৈশ্বিক উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে আংশিকভাবে হলেও বাণিজ্যিক চলাচল অব্যাহত রয়েছে।
সোমবার ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ওয়াশিংটন সময় মঙ্গলবার রাত ৮টার মধ্যে ইরান যদি হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার বিষয়ে কোনো চুক্তিতে না পৌঁছায়, তাহলে তিনি ‘এক রাতেই’ ইরানকে ধ্বংস করে দিতে পারেন। তবে তার এ হুমকির আগেই কয়েকটি দেশ তেহরানের সঙ্গে এমন সমঝোতা করে, যার ফলে তাদের জাহাজ এই নৌপথ ব্যবহার করতে পারছে।
বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সাধারণত হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। সাম্প্রতিক উত্তেজনা ও হামলার আশঙ্কায় এ পথের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। পরিবহন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় তেলের দামও দ্রুত বেড়ে গেছে।
এশিয়ার দেশগুলো, বিশেষ করে জ্বালানিনির্ভর অর্থনীতির দেশগুলো, এখন ইরানের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। পাকিস্তান, ভারত, ফিলিপাইন এবং চীন জানিয়েছে, তাদের কিছু জাহাজ হরমুজ প্রণালী ব্যবহার করতে পেরেছে। তবে এসব সমঝোতার পরিধি, শর্ত এবং মেয়াদ নিয়ে এখনো স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
কূটনীতির ফল
ফিলিপাইন সর্বশেষ দেশ হিসেবে ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছেছে। দেশটির পররাষ্ট্রসচিব থেরেসা লাজারো জানিয়েছেন, ইরানি কর্মকর্তারা ফিলিপাইনের পতাকাবাহী জাহাজগুলোর জন্য ‘নিরাপদ, বাধাহীন ও দ্রুতগতির’ চলাচলের নিশ্চয়তা দিয়েছেন। তিনি বলেন, তেহরানের সঙ্গে ফলপ্রসূ ফোনালাপের মাধ্যমে এ সমঝোতা হয়েছে, যা দেশটির জ্বালানি ও সার সরবরাহ নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ।
ফিলিপাইনের জ্বালানিনির্ভরতা এ উদ্বেগকে আরও বাড়িয়েছে। দেশটি মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রায় ৯৮ শতাংশ তেল আমদানি করে। ইরানকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা শুরুর পর জ্বালানির দাম দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় ফিলিপাইন জাতীয় জ্বালানি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে।
পাকিস্তানও জানিয়েছে, তাদের ২০টি জাহাজকে হরমুজ প্রণালী দিয়ে যেতে দিতে ইরান সম্মত হয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার একে ‘ইরানের ইতিবাচক ও গঠনমূলক পদক্ষেপ’ বলে মন্তব্য করেছেন। একইভাবে ভারতীয় পতাকাবাহী জাহাজের জন্যও ইরান প্রকাশ্যে নিরাপত্তার বার্তা দিয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বলেন, তাদের তেলবাহী জাহাজ চলাচল সম্ভব হয়েছে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার কারণে।
চীনও স্বীকার করেছে, তাদের অন্তত তিনটি জাহাজ সম্প্রতি হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করেছে। যদিও বেইজিং এ বিষয়ে বিস্তারিত জানায়নি। একই সময়ে নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ইরানি তেলের বড় চালান চীনে পৌঁছানোর খবরও এসেছে।
যা এখনো অজানা
এসব জাহাজ কী শর্তে নিরাপদ পারাপারের অনুমতি পেয়েছে, কোনো ধরনের টোল বা বিশেষ ফি দেওয়া হয়েছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। জাপানের একটি এলএনজি বহনকারী জাহাজ এবং মালয়েশিয়ার কিছু তেলবাহী জাহাজও সম্প্রতি হরমুজ প্রণালী পার হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে এসব ক্ষেত্রে কী ধরনের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানের সঙ্গে এসব সমঝোতা তাৎক্ষণিকভাবে কিছু জাহাজ চলাচলের পথ খুলে দিলেও এটি স্থায়ী সমাধান নয়। কোন দেশের কতটি জাহাজ, কতদিন এবং কোন শর্তে এ সুবিধা পাবে, তা এখনো অনিশ্চিত। একই সঙ্গে অঞ্চলের সামরিক পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে এসব নিশ্চয়তা কতটা কার্যকর থাকবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়ে গেছে।
শিপিং বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, নিরাপদ পারাপারের এই নিশ্চয়তা সব জাহাজের জন্য প্রযোজ্য কি না, নাকি কেবল নির্দিষ্ট দেশের পতাকাবাহী জাহাজের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ—এটি এখনো পরিষ্কার নয়। ফলে হরমুজ প্রণালী ঘিরে কূটনৈতিক অগ্রগতি দেখা গেলেও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি।