
টাকার কাছে আদর্শ, রাজনীতি এবং ত্যাগ যে কতটা মূল্যহীন, তা প্রমানিত হলো মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার লেছরাগঞ্জ বালুমহাল ইজারাকে কেন্দ্র করে।এ নিয়ে স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
জেলা প্রশাসন কতৃক ১৪৩৩বঙ্গাব্দের জন্য বালুমহালটির ইজারা পেয়েছে ‘খান এন্টারপ্রাইজ’। কাগজপত্রে প্রতিষ্ঠানটির মালিক হিসেবে দেখা যাচ্ছে স্থানীয় বিএনপি-সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী মো. বিল্লাল খানের নাম। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, বালুমহালটির প্রকৃত নিয়ন্ত্রণে রয়েছেন স্থানীয় রাজনীতিতে প্রভাবশালী একটি পরিবার, যাদের অতীতে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ছিল। ফলে স্থানীয়রা বলছেন, এটি মূলত টাকার কাছে আদর্শ আর নীতির পরাজয়।
এবিষয়ে স্থানীয় একটি সুত্র জানিয়েছে, জেলা প্রশাসনের উর্দ্ধতনদের ম্যানেজ করে বালু মহালটি ইজারার নামে নিজেদের নিয়ন্ত্রনে নিয়েছেন স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতা আলী আকবর খান ও তার ভাই আকিবুল খান। যারা গত দেড়যুগ আওয়ামীলীগকে অর্থায়ন করে আসছেন নিয়মিত । জানা যায়, তাদের অর্থায়নে স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের উপর জেল জুলুম ও পুলিশী হয়রানি চলাত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকার ।
আওয়ামী সুবিধাভোগী এই দুই ভাই এক সময় স্থানীয় এমপি মমতাজের ঘনিষ্টজন হিসেবে পরিচিত ছিলেন ।অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতার পরিবর্তনের সাথে এই ভাতৃদ্বয়ই এখন বিএনপির স্থানীয় এক সংসদ সদস্যের আপনজন হয়ে উঠেছেন। স্থানীয়দের মাঝে অভিযোগ রয়েছে, ওই সংসদ সদস্যের সব খরচ বহন করেন এই আলী আকবর খান ও আকিবুল খান। ঐ সংসদ সদস্যের নির্বাচনী সব খরচ তারা বহন করেছেন এমনটাও প্রচলিত রয়েছে স্থানীয়দের মাঝে । তাই আওয়ামীলীগ সম্পৃক্ততা থাকলেও, বর্তমান সংসদ সদস্য তাদের ফেলতে পারেন না।
এদিকে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী হওয়ায় স্থানীয়রা এসব অভিযোগ নিয়ে মুখ খুলতে সাহস পাননা। অথচ পট পরিবর্তনের আগেও খান পরিবারের প্রকাশ্য আওয়ামীপ্রীতি সবার জানা। এদিকে ১৭ বছর নির্যাতনের শিকার মানিকগঞ্জ বিএনপির ত্যাগী নেতারা এখন এই 'খান পরিবার' এর কাছে কোনঠাসা।
ছয় ভাইয়ের প্রভাবশালী এই পরিবারটি এখনও পুরো মানিকগঞ্জের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার চেষ্টা করছেন ।তবে টাকার জোড়ে বারবার এসব করে পার পেয়ে যাচ্ছেন তারা ।এছাড়া প্রভাব প্রতিপত্তিকে কাজে লাগিয়ে নামে-বেনামে সম্পদ কেনার পাশাপাশি শত শত বিঘা জমি দখলের অভিযোগও রয়েছে খান পরিবারের বিরুদ্ধে।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী আওয়ামী পরিবারটি আগের বছরও নেপথ্য থেকে বালু মহাল ব্যবসার নিয়ন্ত্রন করে । যদিও তারা সাংবাদিক সম্মেলন করে দাবি করে, ব্যবসার সাথে তারা জড়িত নন ।তবে বাস্তবতা বলে ভিন্ন কথা । গত বছর ফরিদপুরের "মিথিলা এন্টারপ্রাইজ" ইজারা পেলেও সেখান থেকেও আয়ের ভাগ নেয় তারা । এমনকি পরবর্তীতে তাদেরকে ব্যবসা-ই করতে দেয়া হয়নি। নানাভাবে বাঁধার মুখে বালু তুলতে দেয়নি এই চক্রটি । জানা যায়, মিথিলা এন্টারপ্রাইজ ১৪৩২ বঙ্গাব্দে ৫ কোটি ৩২ লাখ ৩২ হাজার ৩২ টাকায় বালু মহালের ইজারা পায়। তবে প্রতিষ্ঠানটির মালিক স্থানীয়ভাবে যুবলীগ রাজনীতিতে সম্পৃক্ত থাকায় স্থানীয় বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের ব্যাবহার করে বালুমহালের নিয়ন্ত্রণ নেয় খান পরিবার। সেসময় তারা স্থানীয় মানুষদের বাড়িঘর ভেঙ্গে যাওয়ার ভয় দেখিয়ে তাদেরকে ক্ষিপ্ত করে তোলে। ফলে বালু উত্তোলন গেলেই সাধারন জনগনকে সামনে রেখে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে দিয়ে বালু উত্তোলনে বাঁধা দেয়া হত।
প্রশাসন এবং পুলিশের কয়েকজন উর্দ্ধতন কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে আকিবুল খান এসব অপকর্ম করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে । নিয়মিত মাসোহারার বিনিমিয়ে আকিবুল খান স্থানীয় বিএনপির একটি বড় অংশকে 'ম্যানেজ করে নিয়েছেন' এমনটাও জানা যায় । এসব কারণে বিএনপির অনেক ত্যাগী নেতাকর্মী ক্ষোভে রাজনীতি থেকে দুরে সরে গেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলা প্রশাসনের একটি সুত্র জানিয়েছে, চলতি বছর বালু মহাল ইজারার নামে নামকাওয়াস্তে টেন্ডার দেখানো হয়। অথচ সবকিছুই ছিল সাজানো। সজীব করপোরেশন ও জমিদার এন্টারপ্রাইজ নামে আরো দুটি প্রতিষ্ঠান টেন্ডারে অংশ নিলেও ৩ কোটি ৪০ লাখ টাকার বিনিময়ে বালুমহালটির ইজারা লাভ করে খান এন্টারপ্রাইজ। এর মধ্যে খান এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. বিল্লাল খান ও সজীব করপোরেশনের মালিক মো. সুরুজ খান আওয়ামী লীগ নেতা আলী আকবর খান ও আকিবুল হাসান খানের চাচাতো ভাইয়ের ছেলে। মূলত একই পরিবারের ডামি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দাড় করিয়ে কৃত্রিম প্রতিযোগিতা দেখানো হয়। ফলে আগেরবার প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকা টেন্ডার মূল্য উঠলেও এবার তা কমে যায়। যার ফলে, সরকার হারিয়েছে একটি বড় অংকের রাজস্ব।
বিষয়য়টি নিয়ে মানিকগঞ্জে আলোচনা-সমালোচনা হলেও কেউ মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না। টেন্ডার হওয়ার আগ থেকেই অনেকে নিশ্চিত ছিলেন যে, খান পরিবার এবার বালু মহালের নিয়ন্ত্রক হবেন। বাস্তবেও সেটিই হয়েছে।
এদিকে জেলা প্রশাসন বলছে, এবার বালুমহালটির সরকারি মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৭ কোটি ৪২ লাখ ৪৮ হাজার ৮০ টাকা। প্রথম দফায় ১৪টি সিডিউল বিক্রি হলেও জমা পড়ে মাত্র ৩টি। প্রথম দফায় খান এন্টারপ্রাইজ প্রস্তাব দেয় ২ কোটি ২০ লাখ টাকা, সজীব করপোরেশন প্রস্তাব দেয় ১ কোটি ৯০ লাখ টাকা এবং জমিদার এন্টারপ্রাইজ প্রস্তাব দেয় ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। প্রথমবার সরকারি মূল্যের তুলনায় দর অনেক কম হওয়ায় দরপত্র বাতিল করে পুনরায় আহ্বান করা হয়। দ্বিতীয় দফায়ও পূর্বের ওই তিনটি প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশ নেয় এবং মূল্য প্রস্তাব দেয়। এবার খান এন্টারপ্রাইজ প্রস্তাব দেয় ২ কোটি ৭০ লাখ টাকা, সজীব করপোরেশন প্রস্তাব দেয় ২ কোটি ৩০ লাখ টাকা এবং জমিদার এন্টারপ্রাইজ প্রস্তাব দেয় ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা। দ্বিতীয় দফাতেও সরকার নির্ধারিত মূল্যের তুলনায় দর কম হওয়ায় পুনরায় দরপত্র আহ্বান করা হয়। তৃতীয় দফার ৮ এপ্রিল দরপত্র খুললে দেখা যায় বিল্লাল খানের প্রতিষ্ঠান সেই ভাগ্যবান যিনি বালু মহালটি পেয়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সুত্র জানিয়েছে, বালু মহাল ইজারার পেছনে জেলা প্রশাসনের দুইজন কর্তাব্যাক্তি সার্বিক সহযোগিতা করেছেন। মোটা অংকের সুবিধা নিয়ে খান পরিবারকে বালু মহালটি তুলে দেয়া হয়েছে। যার পেছনে স্থানীয় বিএনপির একটি অংশেরও হাত রয়েছে। এমনকি জেলা পুলিশের শীর্ষ দুএকজন কর্তাব্যাক্তিও বিশেষ সুবিধা নিয়েছেন বলে ওই সুত্রটি নিশ্চিত করেছে।
এসব বিষয়ে আলী আকবর খানের সাথে কয়েকদফায় কথা বলার চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভড করেননি।অপরদিকে আকিবুল খান স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে বালু মহাল নিয়ন্ত্রনের বিষয়টি স্বীকার করেছেন, যার একটি অডিও রেকর্ড প্রতিবেদকের কাছে । রেকর্ডটিতে প্রশাসন এবং পুলিশকে কিভাবে ম্যানেজ করা হয়, সে বিষয়েও তাদের ধারনা দেন আকিবুল খান।