
দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের যুগে প্রবেশ করল বাংলাদেশ। দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুরের প্রথম ইউনিটে মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) পারমাণবিক জ্বালানি ইউরেনিয়াম লোডিং কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
বিকেলে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এলাকায় আয়োজিত অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন এবং রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি সংস্থা রোসাটমের মহাপরিচালক অ্যালেক্সি লিখাচেভ। ভিডিও বার্তায় বাংলাদেশকে শুভেচ্ছা জানান আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রসি।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দেশের জ্বালানি খাতে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। এই বিদ্যুৎকেন্দ্র দেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলা ও আর্থসামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, গত ১৬ এপ্রিল বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ রূপপুরের প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিংয়ের লাইসেন্স দেয়। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড ও কারিগরি শর্ত পূরণের পরই এ কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।
প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিং শেষ হতে প্রায় ৪৫ দিন সময় লাগবে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে জুলাইয়ের শেষ দিকে অথবা আগস্টের শুরুতে রূপপুর থেকে পরীক্ষামূলকভাবে অন্তত ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে পারে। চলতি বছরের শেষ দিকে অথবা আগামী বছরের শুরুতে প্রথম ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে পারে বলে আশা করছে সংশ্লিষ্টরা।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের উৎপাদন ক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। দুটি ইউনিট পূর্ণ উৎপাদনে গেলে এখান থেকে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে।
পাবনার ঈশ্বরদীতে পদ্মা নদীর তীরে নির্মিত এই প্রকল্পে রাশিয়ার আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা রয়েছে। প্রকল্পে তৃতীয় প্রজন্মের উন্নত ভিভিইআর-১২০০ প্রযুক্তির দুটি রিঅ্যাক্টর স্থাপন করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত রিঅ্যাক্টর প্রযুক্তিতে উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থা, স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ, আধুনিক কন্টেইনমেন্ট কাঠামো, কোর ক্যাচার এবং মাল্টি-লেভেল সেফটি ডিজাইন রয়েছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী এটি নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য পারমাণবিক প্রযুক্তি হিসেবে স্বীকৃত।
নিউক্লিয়ার পাওয়ার কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জাহেদুল হাসান জানান, প্রকল্পের রিঅ্যাক্টর ভবন, টারবাইন ভবন, কুলিং সিস্টেম, বৈদ্যুতিক সাবস্টেশন এবং সহায়ক স্থাপনাসহ প্রায় ৩৮৯টি অবকাঠামোর নির্মাণকাজ প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। জ্বালানি লোডিংয়ের পর ধাপে ধাপে রিঅ্যাক্টরের শক্তি বাড়ানো হবে এবং নিরাপত্তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করা হবে।
তিনি বলেন, জাতীয় গ্রিডে পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রায় ১০ মাস সময় প্রয়োজন হতে পারে।
রূপপুর প্রকল্পের ইতিহাস দীর্ঘ। ১৯৬০-এর দশকে দেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের ধারণা আসে। ১৯৬২ সালে সম্ভাব্য কয়েকটি স্থান মূল্যায়নের পর পাবনার রূপপুরকে উপযুক্ত স্থান হিসেবে নির্বাচন করা হয়। পরবর্তীতে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে প্রকল্পটি দীর্ঘদিন স্থগিত ছিল।
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে রূপপুর প্রকল্পের পারমাণবিক জ্বালানি ইউরেনিয়াম দেশে আসে। এতদিন তা সর্বোচ্চ নিরাপত্তায় প্রকল্প এলাকায় সংরক্ষিত ছিল। মঙ্গলবার থেকে সেই জ্বালানি রিঅ্যাক্টর প্রেসার ভেসেল বা চুল্লিপাত্রে স্থাপনের কার্যক্রম শুরু হলো।
করোনা মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক নানা প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, রূপপুর চালু হলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী হবে, শিল্পায়ন ত্বরান্বিত হবে এবং কার্বনমুক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।