
নিরাপদ পানির ক্রমবর্ধমান চাহিদা মোকাবিলা এবং রাজধানীর বিদ্যমান পানি সরবরাহব্যবস্থা স্থিতিশীল রাখতে ৯২০ কোটি ৮৫ লাখ টাকার একটি প্রকল্প নিয়েছে সরকার।
‘ইমার্জেন্সি ওয়াটার সাপ্লাই ইন ঢাকা সিটি’ নামের প্রকল্পটি অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা হিসেবে নেওয়া হয়েছে। নির্মাণাধীন বড় ভূ-পৃষ্ঠস্থ পানি শোধনাগারগুলো চালুর আগ পর্যন্ত রাজধানীর পানির চাহিদা পূরণ ও সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখাই এ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য।
স্থানীয় সরকার বিভাগ প্রস্তাবিত প্রকল্পটি শতভাগ সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়ন করবে ঢাকা ওয়াটার সাপ্লাই অ্যান্ড স্যুয়ারেজ অথরিটি বা ঢাকা ওয়াসা। প্রকল্পটি ২০৩০ সালের জুনের মধ্যে বাস্তবায়নের কথা রয়েছে। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি-একনেকের সর্বশেষ বৈঠকে প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের প্রোগ্রামিং বিভাগের সদস্য সচিব এস এম শাকিল আখতার বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর ক্রমবর্ধমান পানির চাহিদা মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তিনি জানান, সর্বশেষ একনেক বৈঠকে ঢাকা ওয়াসাকে ভূগর্ভস্থ পানির অবস্থা, পানি পুনর্ব্যবহার এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের সর্বোত্তম ব্যবহার নিয়ে একটি সমীক্ষা পরিচালনা করে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, প্রকল্পটির তিনটি প্রধান লক্ষ্য রয়েছে। এগুলো হলো—ঢাকা মহানগরের বিদ্যমান পানি সরবরাহব্যবস্থা স্থিতিশীল রাখা, দৈনিক অতিরিক্ত ৫৭৬ মিলিয়ন লিটার পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং সুপারভাইজরি কন্ট্রোল অ্যান্ড ডাটা অ্যাকুইজিশন বা স্কাডা ব্যবস্থা স্থাপনের মাধ্যমে পাম্প পরিচালনা ও পানি ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন করা।
বর্তমানে ঢাকা ওয়াসা ভূগর্ভস্থ ও ভূ-উপরিস্থ উৎস থেকে প্রায় ২ হাজার ৯৭৭ এমএলডি পানি উৎপাদন ও সরবরাহ করছে। এই পানি ঢাকা ও আশপাশের প্রায় ২ কোটি মানুষের চাহিদা পূরণ করছে।
কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে মোট পানি উৎপাদনের ৬৬ শতাংশ আসে ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে এবং বাকি ৩৪ শতাংশ আসে ভূ-উপরিস্থ উৎস থেকে। দ্রুত নগরায়ণ, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের কারণে মাথাপিছু পানির ব্যবহার বেড়েছে। ফলে রাজধানীর পানি সরবরাহ নেটওয়ার্কের ওপর চাপও বাড়ছে। ২০২৯ সালের মধ্যে ঢাকায় পানির চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৫৫৮ এমএলডিতে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দীর্ঘমেয়াদে পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঢাকা ওয়াসা ধীরে ধীরে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়ানোর কৌশল গ্রহণ করেছে। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ৫০০ এমএলডি সক্ষমতার গন্ধর্বপুর পানি শোধনাগার ফেজ-১ এবং ৪৫০ এমএলডি সক্ষমতার সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার ফেজ-৩ নির্মাণাধীন রয়েছে। এগুলো যথাক্রমে ২০২৬ ও ২০২৮ সালে চালু হওয়ার কথা রয়েছে।
এসব শোধনাগার চালু না হওয়া পর্যন্ত জরুরি প্রকল্পটি অস্থায়ী ব্যবস্থা হিসেবে পানি উৎপাদন সচল রাখা এবং নগরবাসীর জন্য নিরবচ্ছিন্ন পানি সরবরাহ নিশ্চিত করবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রকল্পের আওতায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রায় ৩৬১ বর্গকিলোমিটার এলাকা অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
প্রধান কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে পানি উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে ৩৮৮টি গভীর নলকূপ প্রতিস্থাপন। এছাড়া ৪৫০টি পাম্প মোটর সেট, ৪৫০টি ভ্যারিয়েবল ফ্রিকোয়েন্সি ড্রাইভ এবং ১২৪টি স্কাডা সিস্টেম সরবরাহ ও স্থাপন করা হবে।
পাশাপাশি ৬০টি গভীর নলকূপ সংস্কার এবং ২৮০টি পুনরায় সচল করা হবে। পানির মান উন্নয়নে ৪৪টি আয়রন রিমুভাল প্ল্যান্ট স্থাপন করা হবে। সরবরাহব্যবস্থা সম্প্রসারণে নির্মাণ করা হবে ২৫০টি পাম্প হাউস।
সঞ্চালন ও পরিচালনাগত নির্ভরযোগ্যতা বাড়াতে প্রকল্পের আওতায় ৪৮০টি পাম্প ডেলিভারি লাইন, ২৮ হাজার মিটার বৈদ্যুতিক ক্যাবল এবং ৪০ হাজার মিটার কলাম পাইপ স্থাপন করা হবে। এছাড়া অবকাঠামো ও পরিচালন সুবিধা সুরক্ষায় প্রায় ৭ হাজার ১৫০ মিটার সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করা হবে।
প্রকল্পটির কারিগরি ও পরিচালনগত সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং একটি সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনা করেছে।
২০২৪ সালের ১৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির বৈঠকে প্রকল্প প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করা হয়। সেখানে কিছু পর্যবেক্ষণ মেনে চলার শর্তে প্রকল্পটি অনুমোদনের সুপারিশ করা হয়।
পরিকল্পনা কমিশন মনে করছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বড় ভূ-পৃষ্ঠস্থ পানি শোধনাগারগুলো চালু না হওয়া পর্যন্ত ঢাকার পানি সরবরাহব্যবস্থার স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সম্ভব হবে।
সূত্র: বাসস