
ঈদুল ফিতরে মুক্তি পাওয়া আলোচিত সিনেমা ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘ ও ব্যতিক্রমী রিভিউ লিখেছেন জাতীয় নাগরিক কমিটির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক ও কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ।
সোমবার রাত ১১টার দিকে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে দেওয়া ওই রিভিউতে তিনি সিনেমাটির গল্প, চরিত্র ও মানবজীবনের দর্শনকে একসূত্রে তুলে ধরেন। তার মতে, ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ শুধু বিনোদনের সিনেমা নয়; বরং এটি জীবনের বহুমাত্রিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।
সিনেমার একটি দৃশ্যের প্রসঙ্গ টেনে হাসনাত লেখেন, অসুস্থ এক মায়ের জন্য হেলিকপ্টার আনার আবদার শুনে মন্ত্রী অবাক হয়ে বলেন, ‘একটা মামুলি বিষয়কে আপনি এত বড় কেন করছেন?’ জবাবে গণিতের অধ্যাপক রশিদ উদ্দিন বলেন, ‘মন্ত্রী সাহেব, মামুলি বিষয়কে বড় করে তোলাই তো মানুষের কাজ!’
হাসনাতের ভাষায়, ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমাটিও ঠিক সেই কাজ করেছে। ছোট ছোট গল্পের মধ্য দিয়ে অনেক মানুষের জীবন ও দুঃখকে তুলে ধরা হয়েছে। সিনেমা দেখার পর বনলতা এক্সপ্রেস আর শুধু একটি ট্রেন মনে হয় না; মনে হয় দুঃখে ভরা জীবন্ত এক বাহন, যার প্রতিটি বগিতে জমে আছে মানুষের আলাদা আলাদা বেদনা।
ডাক্তার আশাব চরিত্রের প্রসঙ্গ টেনে তিনি লেখেন, ম্যাজিক দেখানো, মায়ের সঙ্গে মজা করা হাসিখুশি ছেলেটিও একসময় হাঁটু গেড়ে বসে বলে, ‘না পারলাম ভালো মানুষ হইতে, না পারলাম ভালো ডাক্তার হইতে…।’ হাসনাতের মতে, আশাব যেন বাংলাদেশের অনেক বড় ছেলের প্রতিচ্ছবি-যাদের পেছনে থাকে শৈশবের ট্রমা, বর্তমানে আফসোস, আর হাতে থাকে কিছু অনর্থক ম্যাজিকের কার্ড।
রিভিউতে তিনি প্রশ্ন তোলেন, নিঃসন্তান কিন্তু ক্ষমতাবান মন্ত্রী আবুল খায়ের, নাকি মাত্র ২৪ বছর বয়সী একমাত্র ছেলের কফিন নিয়ে যাত্রা করা রশিদ উদ্দিন-কার দুঃখ আসলে বেশি?
তিনি আরও লেখেন, একই ট্রেনে যেখানে একজন তরুণ কফিনে চড়ে যাচ্ছে, সেখানে আরেক তরুণী নতুন জীবন শুরু করতে যাচ্ছে। একজনের যাত্রা বিদায়ের দিকে, অন্যজনের যাত্রা আগমনের দিকে। এভাবেই সিনেমাটি শেষ ও শুরুকে একই রেললাইনে বেঁধেছে।
গণিতের অধ্যাপক রশিদ উদ্দিনের সংলাপ তুলে ধরে হাসনাত লেখেন, ‘হোল ওয়ার্ল্ডে আমি ম্যাথে জায়ান্ট নাম্বার এইট, কিন্তু ম্যাথ আমার হাতে নাই, ম্যাথ আমার হাতে নাই...।’ এরপর তিনি প্রশ্ন করেন, ‘ম্যাথ কি আসলে আমাদের কারও হাতেই থাকে? নাকি আমাদের সব ম্যাথের সমাধান নিয়ে ওপরে একজন বসে থাকেন আর আমাদের হিসাব মেলানোর ছোটাছুটি দেখেন?’
জন্ম ও মৃত্যুর মধ্যবর্তী জীবনকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি লেখেন, ‘জানাজার নামাজের কোনো আজান হয় না। কারণ জন্মের সময়ই আমাদের কানে আজান দিয়ে দেওয়া হয়। জন্মের সময় আজান আর মৃত্যুর সময় তার নামাজ। এর মাঝখানের সময়টুকুই আমাদের জীবন।’
হাসনাত আব্দুল্লাহর মতে, ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ আসলে একটি পৃথিবী। যে পৃথিবীর এক পাশে সন্তানের কফিন, অন্য পাশে নতুন শিশুর জন্ম। এক পাশে ক্ষমতার দম্ভ, অন্য পাশে মানুষের প্রতি ভালোবাসা। এক পাশে হারানোর কষ্ট, অন্য পাশে নতুন করে বাঁচার হাতছানি।
তিনি লেখেন, দিনশেষে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ আমাদের সবার গল্প। জন্মের আজান, মৃত্যুর জানাজা, হারানোর দুঃখ কিংবা পাওয়ার আনন্দ-সবকিছু নিয়েই মানুষের জীবন। বারবার পড়ে যাওয়ার পরও আবার উঠে দাঁড়িয়ে ছুটে চলাই মানবজীবনের নিয়তি।
হাসনাত আরও লেখেন, বনলতা এক্সপ্রেসকে থামানো যায় না। কারণ এই ট্রেন মানবজীবনের মতোই চলমান। এখানে স্থবিরতা নয়, রূপান্তরই চূড়ান্ত সত্য। সেই রূপান্তরের ভেতর দিয়েই মানুষ অশ্রুকে অভিজ্ঞতায়, সংগ্রামকে সাফল্যে, দুঃখকে মহাকাব্যে এবং সম্ভাবনাকে ইতিহাসে পরিণত করে।
উল্লেখ্য, ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ নির্মাণ করেছেন তানিম নুর। প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয় উপন্যাস ‘কিছুক্ষণ’ অবলম্বনে নির্মিত সিনেমাটি অ্যাডভেঞ্চার, রোমান্টিক ও কমেডি ঘরানার একটি চলচ্চিত্র।
সম্প্রতি সিনেমাটির প্রদর্শনী ঘিরে বিভিন্ন এলাকায় আলোচনা-সমালোচনা ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এর মধ্যেই হাসনাত আব্দুল্লাহর রিভিউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে আলোচনায় এনেছে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’কে।