
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের আকার বড় হলেও তা বাস্তবায়ন অসম্ভব নয় বলে মনে করে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠন এফবিসিসিআই। তবে বাজেটের লক্ষ্য অর্জনে দূরদর্শী পরিকল্পনা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা ও কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
শনিবার প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে প্রকাশিত পর্যবেক্ষণে এসব কথা জানায় ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই)।
সংগঠনটির মতে, প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও সামাজিক ন্যায়বিচারকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ায় সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়েছে এফবিসিসিআই।
অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সরকারের ঘোষিত ‘রিকভারি অ্যান্ড স্ট্যাবিলাইজেশন, রেস্টোরেশন অ্যান্ড রিকনস্ট্রাকশন’ বা ‘থ্রিআর’ কৌশল অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরানো, বিনিয়োগ বাড়ানো এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়ক হবে বলে আশা করছে সংগঠনটি।
আগামী অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি। বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এ বাজেট বাস্তবায়ন বড় চ্যালেঞ্জ হলেও সঠিক পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তা সম্ভব বলে মনে করে এফবিসিসিআই।
প্রস্তাবিত বাজেটে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্য অর্জনে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও ব্যবসা-বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সংস্কার জরুরি বলে জানিয়েছে সংগঠনটি।
বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা মোট দেশজ উৎপাদনের ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। এই ঘাটতি পূরণে দেশীয় ও বৈদেশিক উৎস থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
ব্যাংক খাত থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়া হলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে এফবিসিসিআই। এ ক্ষেত্রে স্বল্পসুদের বৈদেশিক অর্থায়নের সুযোগ কাজে লাগানো এবং সতর্ক ঋণ ব্যবস্থাপনার পরামর্শ দিয়েছে সংগঠনটি।
আগামী অর্থবছরে সরকারকে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা সুদ পরিশোধ করতে হবে। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ ১ লাখ ৫ হাজার কোটি এবং বৈদেশিক ঋণের সুদ ২২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। বিষয়টিকে বড় আর্থিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে এফবিসিসিআই।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি, নিম্ন কর-জিডিপি অনুপাত, খেলাপি ঋণ, বৈদেশিক ঋণের চাপ ও বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তাকে বাজেট বাস্তবায়নের প্রধান ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংগঠনটি।
অর্থনীতি শক্তিশালী করতে অর্থনৈতিক অঞ্চল কার্যকর করা, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, নতুন বাজার অনুসন্ধান, তথ্যপ্রযুক্তি ও ইলেকট্রনিকস খাতে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানোর সুপারিশ করেছে এফবিসিসিআই।
এ ছাড়া পুঁজিবাজার ও বন্ড মার্কেট শক্তিশালী করা, ব্যাংকিং খাত সংস্কার, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ, লজিস্টিক ও সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়ন, মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল প্রতিষ্ঠার আইনি কাঠামো তৈরি এবং ব্লু ইকোনমির সম্ভাবনা কাজে লাগানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘কৃষক কার্ড’ চালু, ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী নাগরিকদের ট্রেনে বিনা মূল্যে ভ্রমণ, মেট্রোরেলে ২৫ শতাংশ ভাড়া ছাড় এবং জুলাই আন্দোলনের যোদ্ধাদের ভাতা অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে এফবিসিসিআই।
এলডিসি উত্তরণের পর বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি, অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি এবং অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি সম্পাদনের উদ্যোগেরও প্রশংসা করেছে সংগঠনটি।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে সরকারের উদ্যোগ, ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পূরণ এবং ২০৩৫ সাল পর্যন্ত সৌরবিদ্যুৎ খাতে শূন্য শতাংশ করহার বজায় রাখার প্রস্তাবকে ইতিবাচক বলে উল্লেখ করেছে এফবিসিসিআই।
বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে ৬০ হাজার কোটি টাকার ‘স্টিমুলাস প্যাকেজ-২০২৬’, এসএমই খাতে ২ হাজার কোটি এবং নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছে সংগঠনটি।
করভিত্তি সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি রোধ, কর প্রশাসনের পূর্ণাঙ্গ স্বয়ংক্রিয়তা, অনলাইনে ভ্যাট ও আয়কর রিটার্ন দাখিল, ডিজিটাল সিঙ্গেল উইন্ডো এবং ঝুঁকিভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় অডিট ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগেরও প্রশংসা করেছে এফবিসিসিআই।
করমুক্ত আয়সীমা সাড়ে ৩ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করায় সন্তোষ প্রকাশ করলেও ৫ শতাংশ কর স্ল্যাব বহাল রাখার প্রস্তাব দিয়েছে সংগঠনটি। একই সঙ্গে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত আয়করের হার ৩৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশ করা এবং তালিকাবহির্ভূত কোম্পানির করহার ও ন্যূনতম টার্নওভার কর আরও কমানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
জীবনযাত্রার ব্যয় ও উৎপাদন খরচ কমাতে শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে অগ্রিম কর হ্রাস, নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষি ও ভোগ্যপণ্যে উৎসে কর কমানো, খেজুর ও রান্নার মসলায় নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক প্রত্যাহার এবং দেশীয় ভোজ্যতেল উৎপাদনে কর প্রণোদনাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে এফবিসিসিআই।
স্টার্টআপ, প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠান, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা, নারী উদ্যোক্তা ও রপ্তানিকারকদের জন্য ঘোষিত কর সুবিধাকেও স্বাগত জানিয়েছে সংগঠনটি।
এ ছাড়া বৈদ্যুতিক যানবাহন, বাস-ট্রাক ও চার্জিং স্টেশনের জন্য কর প্রণোদনাকে পরিবেশবান্ধব পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এমএস রডের কিছু পণ্যে উৎপাদন পর্যায়ে নির্দিষ্ট ভ্যাট বৃদ্ধির প্রস্তাবে উদ্বেগ প্রকাশ করে এফবিসিসিআই বলেছে, এর নেতিবাচক প্রভাব নির্মাণ খাতে পড়তে পারে।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য সহজ টার্নওভার কর ব্যবস্থা, ক্ষুদ্র আমানতে আবগারি শুল্ক অব্যাহতি, স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট সুবিধা, ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট নির্মাতাদের ভ্যাট অব্যাহতি এবং কর-শুল্ক-ভ্যাট আপিল প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগকেও ইতিবাচক হিসেবে দেখছে সংগঠনটি।
বন্ডেড ওয়্যারহাউস ব্যবস্থায় স্বর্ণ আমদানি ও গহনা রপ্তানির নতুন বিধিমালা এবং স্বর্ণ ও স্বর্ণালংকার লেনদেনে উৎসে কর কমানোর সিদ্ধান্তকেও স্বাগত জানিয়েছে এফবিসিসিআই।
সংগঠনটি মনে করে, বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও অর্থনৈতিক মেরুকরণের মধ্যেও প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবসম্মত, বাস্তবায়নযোগ্য ও বিনিয়োগবান্ধব আর্থিক কাঠামো উপস্থাপন করেছে। এটি প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও জবাবদিহিমূলক সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হতে পারে।
এফবিসিসিআই জানিয়েছে, সংগঠনটির বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব বাজেটে প্রতিফলিত হয়েছে। অর্থবিলসহ কর, ভ্যাট ও শুল্কসংক্রান্ত প্রস্তাব পর্যালোচনা শেষে সদস্য সংগঠনগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সরকারকে আরও সুপারিশ দেওয়া হবে।