
যুদ্ধ অবসানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি প্রাথমিক চুক্তি কয়েক দিনের মধ্যে সই হতে পারে। সবকিছু পরিকল্পনামতো এগোলে দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে চুক্তিতে স্বাক্ষর করবেন।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ শনিবার চুক্তির সম্ভাবনার কথা জানানোর পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। তবে ইরান বলেছে, চুক্তিটি রোববার নয়, পরবর্তী কয়েক দিনের মধ্যে স্বাক্ষরিত হতে পারে।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, চুক্তি সইয়ের পরপরই হরমুজ প্রণালি সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। পুরো প্রক্রিয়া দ্রুত ও নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে শাহবাজ শরিফ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় শান্তিচুক্তির কাছাকাছি পৌঁছেছে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে চুক্তির চূড়ান্ত রূপ দেওয়া হতে পারে এবং পরে তা ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে স্বাক্ষরিত হবে। পরবর্তী সপ্তাহে কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা হওয়ার কথাও জানান তিনি।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই অবশ্য বলেন, চুক্তি স্বাক্ষরের সুনির্দিষ্ট সময় জানতে আরও অপেক্ষা করতে হবে। এটি রোববার নয়, কয়েক দিনের মধ্যে হতে পারে।
চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলার মধ্যেই শনিবার ভোরে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের একাধিক ড্রোন ধ্বংসের দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ইরানের কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
আশাবাদী তিন পক্ষ
যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের কর্মকর্তারা শুক্রবার থেকে সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে আশাবাদ প্রকাশ করে আসছেন। তাঁদের বক্তব্যে কয়েক দিনের মধ্যেই একটি প্রাথমিক সমঝোতা হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় চূড়ান্ত পর্যায়ের কাছাকাছি পৌঁছেছে। তবে সব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ ঐকমত্য না হওয়া পর্যন্ত কোনো সমঝোতা নিশ্চিত বলে ধরে নেওয়া উচিত নয় বলেও সতর্ক করেন তিনি।
আরাগচি জানান, সম্ভাব্য চুক্তিটি সরাসরি উপস্থিত হয়ে নয়, ইলেকট্রনিক বা দূরবর্তী পদ্ধতিতে স্বাক্ষর করা হবে।
এর আগে এক পশ্চিমা কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছিলেন, সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চুক্তি সই হতে পারে। ট্রাম্পও এ ধরনের সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন।
সম্ভাব্য চুক্তিতে যা থাকতে পারে
প্রস্তাবিত চুক্তির ধারাগুলো এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। তবে বিভিন্ন সূত্রের দাবি, চুক্তি সইয়ের সঙ্গে সঙ্গে হরমুজ প্রণালি জাহাজ চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হতে পারে। ইরানের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার এবং তেহরানের ওপর আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিষয়ও এতে থাকতে পারে।
এ ছাড়া বিদেশে জব্দ থাকা ইরানের কিছু অর্থ ছাড় দেওয়ার সম্ভাবনার কথাও বলা হচ্ছে।
প্রাথমিক চুক্তিতে পারমাণবিক ইস্যু অন্তর্ভুক্ত না-ও থাকতে পারে। এ বিষয়ে পরবর্তী ৬০ দিনের আলোচনার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা রয়েছে।
হোয়াইট হাউসের দাবি, প্রাথমিক সমঝোতায় ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি বাতিল এবং সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ধ্বংস বা অন্যত্র স্থানান্তরে সম্মত হয়েছে। তবে ইরান এ দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ধ্বংস বা বিদেশে পাঠানো হবে না; দেশে রেখেই এর মান কমানো হবে।
যুদ্ধ ও আলোচনার প্রেক্ষাপট
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরু করে। ৪০ দিন পর, ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়।
এরপর ১১ ও ১২ এপ্রিল ইসলামাবাদে দুই দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রায় ২১ ঘণ্টার বৈঠক হলেও কোনো সমঝোতা হয়নি। পরে দ্বিতীয় দফা আলোচনার চেষ্টা চলতে থাকে। শেষ পর্যন্ত সরাসরি বৈঠকের পরিবর্তে ডিজিটাল পদ্ধতিতে চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার প্রথম দিনেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ একাধিক শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতা নিহত হয়েছেন বলে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে। খামেনির দাফনের আনুষ্ঠানিকতা ৪ জুলাই শুরু এবং ৯ জুলাই মাশহাদে তাঁকে দাফন করার কথা রয়েছে।
ইউরেনিয়াম মজুতের নিরাপত্তা জোরদার
সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত সুরক্ষিত রাখতে ইরান আরও কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে বলে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্য সম্পর্কে অবগত কয়েকটি সূত্র দাবি করেছে।
সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র যাতে অভিযান চালিয়ে ইউরেনিয়ামের মজুত দখল করতে না পারে, সে জন্য কিছু টানেল ধ্বংস এবং প্রবেশপথে বিস্ফোরক মাইন স্থাপন করেছে তেহরান।
ইরানের কাছে ৪৪০ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম থাকার কথা বলা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ওই মজুত উদ্ধার বা সরিয়ে নেওয়ার যেকোনো অভিযান এখন আরও কঠিন, ঝুঁকিপূর্ণ ও সময়সাপেক্ষ হয়ে উঠেছে।