
জুলাই থেকে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রথম ধাপে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের তুলনায় নিচের গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন বেশি হারে বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে সরকার। সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের সহায়তা করতেই এ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সূত্র বলছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডভুক্ত কর্মচারীদের বেতন তুলনামূলক বেশি বাড়ানো হতে পারে। বিপরীতে, প্রথম থেকে নবম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন প্রথম বছরে কম হারে বাড়ানোর পরিকল্পনা বিবেচনা করা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থিত এক প্রতিমন্ত্রী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে বৈঠকের এজেন্ডায় না থাকলেও বিবিধ আলোচনায় বিষয়টি উঠে আসে।
তিনি বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ঘোষণা অনুযায়ী তিন অর্থবছরে ধাপে ধাপে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছে সরকার।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে পারিবারিক ব্যয় বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে মন্ত্রিসভার সদস্যরা প্রথম বছরে স্বল্প আয়ের কর্মচারীদের বেতন তুলনামূলক বেশি বাড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, বেতন বাড়ানো হলে সরকারের পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। তবে সেই অনুপাতে রাজস্ব আয় বাড়ার নিশ্চয়তা নেই। অন্যদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে কম বেতনের কর্মচারীরা জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে চাপের মধ্যে রয়েছেন। এ পরিস্থিতিতে বেশি বেতন পাওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন কম হারে এবং কম বেতন পাওয়া কর্মচারীদের বেতন বেশি হারে বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সরকার আগামী ১ জুলাই থেকে সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছে।
সূত্র জানায়, শুরুতে বর্তমান কাঠামোর তুলনায় নতুন পে-স্কেলে মূল বেতন যতটা বাড়বে, তার ৫০ শতাংশ করে পরপর দুই অর্থবছরে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। তৃতীয় অর্থবছরে দেওয়ার কথা ছিল বর্ধিত ভাতার অংশ। তবে এখন সেই পরিকল্পনায় পরিবর্তন আসতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, প্রথম থেকে নবম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতন যতটা বাড়বে, তার ৪০ শতাংশ আগামী অর্থবছরে দেওয়া হতে পারে। আর ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের বর্ধিত মূল বেতনের ৬০ শতাংশ প্রথম বছরেই দেওয়ার পরিকল্পনা বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়নি।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গঠিত জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর সুপারিশ করেছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫ গঠন করা হয়। গত ২১ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার কাছে প্রতিবেদন জমা দেয় কমিশন।
কমিশন সরকারি কর্মচারীদের বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করেছে। কর্মকর্তাদের হিসাবে, এই সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হলে সরকারের অতিরিক্ত ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে।
এ ছাড়া বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস পে-কমিশন-২০২৫ এবং সশস্ত্র বাহিনী বেতন কমিশন-২০২৫ বিচার বিভাগ ও সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের বেতন বাড়ানোর সুপারিশ করে পৃথক প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।
নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ২১ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে তিনটি কমিশনের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে সুপারিশ তৈরির জন্য ১০ জন সচিবের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি ইতোমধ্যে তিনটি বৈঠক করেছে।
সূত্র জানায়, কমিটি জাতীয় বেতন কমিশনের প্রতিবেদন বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করলেও এখনো সুপারিশ চূড়ান্ত করেনি। চূড়ান্ত সুপারিশ তৈরির আগে সরকারকে সম্ভাব্য বেতন কাঠামো সম্পর্কে ধারণা দিতে একটি খসড়া মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হয়েছে।
কমিটির খসড়া সুপারিশে মূল বেতন সর্বোচ্চ ১২০ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে। তবে সর্বনিম্ন কত শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে, তা জানা যায়নি।
বিচার বিভাগ ও সশস্ত্র বাহিনীর জন্য গঠিত অন্য দুটি কমিশনের প্রতিবেদনও পর্যালোচনা করা হয়েছে। তবে সেগুলো এখনো চূড়ান্ত হয়নি। আগামী মাসে তিনটি প্রতিবেদন চূড়ান্ত করে মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থাপনের কথা রয়েছে।
বর্তমানে সরকারি কর্মচারীরা ২০টি গ্রেডে কর্মরত। বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তারা সাধারণত নবম গ্রেডে নিয়োগ পান। অন্য শ্রেণির কর্মচারীরা ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের বিভিন্ন পদে নিয়োগ পেয়ে থাকেন।
গত ২ এপ্রিল জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আবদুল বারী জাতীয় সংসদে জানান, দেশে বর্তমানে সরকারি চাকরিতে ১৪ লাখ ৫০ হাজার ৮৯১ জন কর্মরত।
এর মধ্যে প্রথম থেকে নবম গ্রেডে কর্মরত রয়েছেন ১ লাখ ৯০ হাজার ৭৭৩ জন। বাকি ১২ লাখ ৬০ হাজার ১১৮ জন ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডে কর্মরত।
তিনি জানান, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ২ লাখ ৩৩ হাজার ৭২৬ জন, তৃতীয় শ্রেণিতে ৬ লাখ ১৩ হাজার ৮৩৫ জন, চতুর্থ শ্রেণিতে ৪ লাখ ৪ হাজার ৫৫৭ জন এবং অন্যান্য শ্রেণিতে ৭ হাজার ৯৮০ জন কর্মচারী রয়েছেন।