
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। রোববার বিকেল ৩টার দিকে তাকে বহনকারী বিমান কুয়ালালামপুরের উদ্দেশে ঢাকা ছেড়ে যায়।
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে দুই দিনের সফরে দেশটিতে যাচ্ছেন তিনি। মালয়েশিয়া সফর শেষে আগামী ২২ জুন রাতে কুয়ালালামপুর থেকে চীনের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে তার।
প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে দুই দেশের মধ্যে ১৩টি সমঝোতা স্মারক, দুটি চুক্তি, একটি অ্যাকশন প্ল্যান এবং প্রটোকল-সংক্রান্ত একটি নোট সই হওয়ার কথা রয়েছে। এ ছাড়া তিস্তা মহাপরিকল্পনা, সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগ ও দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার বিভিন্ন বিষয় আলোচনায় আসবে।
শনিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফরের বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী ২৩ থেকে ২৬ জুন চীনে অবস্থান করবেন।
পররাষ্ট্র সচিবের দেওয়া সূচি অনুযায়ী, মালয়েশিয়া সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী ২২ জুন বিকেলে রওনা হয়ে সন্ধ্যায় চীনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় বন্দরনগরী ডালিয়ানে পৌঁছাবেন।
পরদিন তিনি ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহীর সঙ্গে বৈঠক করবেন। পাশাপাশি সামার দাভোসে অংশ নেওয়া কাজাখস্তান, মঙ্গোলিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধানের সঙ্গে তার দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
সন্ধ্যায় চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের দেওয়া স্বাগত নৈশভোজে অংশ নেবেন তারেক রহমান।
২৪ জুন সকালে সামার দাভোসের ১৩তম বার্ষিক সভার মূল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী। এবারের সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ‘ইনোভেটিং অ্যাট স্কেল’। অনুষ্ঠান শেষে দুপুরে ট্রেনে বেইজিংয়ের উদ্দেশে যাত্রা করবেন তিনি। সেখানে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন দিয়াওইউতাই স্টেট গেস্ট হাউসে অবস্থান করবেন।
২৫ জুন সকালে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী, দেশটির বাণিজ্যমন্ত্রী, চায়না ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন এজেন্সির চেয়ারম্যান এবং এক্সিম ব্যাংকের প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর পৃথক বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) আয়োজনে ‘বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরাম’ নামের একটি সম্মেলনেও বক্তব্য দেবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে চীনা ব্যবসায়ীদের সামনে বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ ও সম্ভাবনা তুলে ধরে বিনিয়োগের আহ্বান জানাবেন তিনি।
একই দিন বিকেলে চীনের গ্রেট হলে দেশটির প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে তারেক রহমানের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। বৈঠকে দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতা আরও জোরদারের উপায় নিয়ে আলোচনা হবে।
বৈঠকের পর দুই প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে কয়েকটি সমঝোতা স্মারক ও চুক্তি সই হওয়ার কথা রয়েছে। পরে তারেক রহমানের সম্মানে চীনের প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া রাষ্ট্রীয় ভোজসভায় অংশ নেবেন তিনি।
২৬ জুন চীনের ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান ঝাও লেজি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। এরপর চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তারেক রহমানের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পাশাপাশি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে। একই দিন বেইজিংয়ের তিয়েনআনমেন স্কয়ারে বীর যোদ্ধাদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাবেন প্রধানমন্ত্রী।
পররাষ্ট্র সচিব জানান, ২৬ জুন বিকেলে প্রধানমন্ত্রী বেইজিং থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হবেন। চীন সফরে এখন পর্যন্ত তার সফরসঙ্গীর সংখ্যা ২৮ জন।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা
প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হবে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র সচিব। তিনি বলেন, উজান থেকে আসা পানিপ্রবাহ ও সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনা বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়।
আসাদ আলম সিয়াম বলেন, “তিস্তা ছাড়াও অন্যান্য নদী ও পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার সম্ভাবনা রয়েছে।”
চীনের প্রেসিডেন্ট ঘোষিত চারটি বৈশ্বিক উদ্যোগে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। সফর শেষে কোন কোন উদ্যোগে বাংলাদেশ যোগ দিচ্ছে, তা জানানো সম্ভব হবে।
পররাষ্ট্র সচিব আশা প্রকাশ করেন, এই সফর বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বিদ্যমান সমন্বিত কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারত্বকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একটি নির্দিষ্ট চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার কাজ চলছে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে চীনের বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের বৈঠকও হবে।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে কর্মী নেওয়ার অনুরোধ
প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরে দেশটির শ্রমবাজারে বাংলাদেশ থেকে আরও কর্মী নেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় তোলা হবে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র সচিব।
তিনি বলেন, মালয়েশিয়া সরকার বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশ থেকে বিদেশি শ্রমিক নিয়োগের বর্তমান প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করছে। এই প্রক্রিয়া শেষ হলে বাংলাদেশ অগ্রাধিকার পাবে বলে আশা করছে ঢাকা।
আসাদ আলম সিয়াম বলেন, “আমাদের পক্ষ থেকে মালয়েশিয়াকে আরও বাংলাদেশি কর্মী নেওয়ার জন্য অনুরোধ জানানো হবে।”
পররাষ্ট্র সচিব আরও জানান, মালয়েশিয়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রথম মুসলিম দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। বাংলাদেশ আসিয়ানের ডায়ালগ পার্টনার হতে আগ্রহী এবং এ ক্ষেত্রে মালয়েশিয়ার সহযোগিতা চায়।
এ ছাড়া রোহিঙ্গা সংকটেও মালয়েশিয়া বাংলাদেশের জোরালো সমর্থক। ফলে প্রধানমন্ত্রীর সফরে শ্রমবাজার, আসিয়ান সহযোগিতা ও রোহিঙ্গা ইস্যু গুরুত্ব পাবে বলে জানান তিনি।