
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কিছুটা কমলেও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এখনো দৈনিক প্রায় ৭৮ কোটি টাকা লোকসান করছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ।
সোমবার জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে সাতক্ষীরা-২ আসনের সংসদ সদস্য মুহাম্মদ আবদুল খালেকের লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি এ তথ্য জানান। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে প্রশ্নোত্তর টেবিলে উত্থাপিত হয়।
মন্ত্রী জানান, গত মার্চ থেকে ১১ জুন পর্যন্ত আমদানি করা জ্বালানি তেলের ঋণপত্র বা এলসি পরিশোধের হিসাবে বিপিসির প্রকৃত লোকসান দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭ হাজার ৩৯ কোটি ৫৬ লাখ টাকা।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে গত মে থেকে জ্বালানি তেলের দাম কিছুটা কমতে শুরু করেছে। তবে দেশের বাজারে এখনো আন্তর্জাতিক মূল্যের তুলনায় কম দামে জ্বালানি তেল বিক্রি করা হচ্ছে।
জুনে প্রতি লিটার ডিজেলের ব্যয় ছিল ১৭৫ টাকা ২২ পয়সা এবং অকটেনের ব্যয় ১৬০ টাকা ৭০ পয়সা। জনস্বার্থ বিবেচনায় ডিজেলের দাম বাড়ানো হয়নি। তবে অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম লিটারে পাঁচ টাকা বাড়ানো হয়েছে।
ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, লোকসান সত্ত্বেও বিপিসি নিজস্ব তহবিল থেকে টানা তিন মাস জ্বালানি তেল আমদানি কার্যক্রম সচল রেখেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম আরও কমে সহনীয় পর্যায়ে এলে দেশের বাজারেও মূল্য কমানোর বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
আবাসিকে নতুন গ্যাস সংযোগের পরিকল্পনা নেই
নরসিংদী-৫ আসনের সংসদ সদস্য মো. আশরাফ উদ্দিনের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান, তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজি সহজলভ্য হওয়ায় আবাসিক খাতে নতুন গ্যাস সংযোগ দেওয়ার আপাতত কোনো পরিকল্পনা নেই।
দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া এবং আমদানি করা এলএনজি সরবরাহে যুক্ত হওয়ার পরও ঘাটতি রয়েছে। এ কারণে ২০২৫ সালের ২৩ জুলাই জারি করা পরিপত্র অনুযায়ী বিদ্যুৎ, সার ও বিশেষায়িত শিল্পাঞ্চল ছাড়া আবাসিক, বাণিজ্যিক ও সিএনজি খাতে নতুন গ্যাস সংযোগ স্থগিত রয়েছে।
মেহেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. তাজউদ্দীন খানের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এপ্রিল পর্যন্ত গড় সরবরাহ ছিল দৈনিক ২ হাজার ৬৫৪ মিলিয়ন ঘনফুট। এতে দৈনিক ঘাটতি রয়েছে প্রায় ১ হাজার ১৪৬ মিলিয়ন ঘনফুট।
সব কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র অবসরে
চট্টগ্রাম-১৫ আসনের সংসদ সদস্য শাহাজাহান চৌধুরীর প্রশ্নের জবাবে জ্বালানিমন্ত্রী জানান, দেশের সব কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র অবসরে পাঠানো হয়েছে।
সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে সরবরাহের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। পাশাপাশি ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
সিরাজগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. সেলিম রেজার প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, বিদ্যুৎ আমদানি ও অন-গ্রিড নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ দেশে বর্তমানে গ্রিডভিত্তিক ১৩৭টি বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু রয়েছে। মে পর্যন্ত এসব কেন্দ্রের মোট স্থাপিত উৎপাদনক্ষমতা ২৯ হাজার ৫৯৩ মেগাওয়াট।
যশোর-৬ আসনের সংসদ সদস্য মো. মোক্তার আলীর প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্মত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা নিয়েছে। নির্বাচনী ইশতেহারের আলোকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনেও বিশেষ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
দেশে পাঁচটি কয়লাক্ষেত্র
সংরক্ষিত আসন-৩৫-এর সংসদ সদস্য সেলিনা সুলতানার প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান, দেশে এ পর্যন্ত বড়পুকুরিয়া, ফুলবাড়ী, দিঘীপাড়া, খালাসীপাড়া ও জামালগঞ্জ-এই পাঁচটি কয়লাক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে।
এর মধ্যে শুধু বড়পুকুরিয়া থেকে ২০০৫ সাল থেকে বাণিজ্যিকভাবে কয়লা উত্তোলন চলছে। ফুলবাড়ী ও দিঘীপাড়া কয়লাক্ষেত্রের সমীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। খালাসীপাড়া ও জামালগঞ্জ কয়লাক্ষেত্রে আংশিক সমীক্ষা হয়েছে।
বিপিসির বিরুদ্ধে ১ হাজার ৪০৯ অডিট আপত্তি
কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মো. মনিরুল হক চৌধুরীর প্রশ্নের জবাবে জ্বালানিমন্ত্রী জানান, বিপিসি ও এর অধীন বিপণন কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে মে পর্যন্ত ১ হাজার ৪০৯টি অডিট আপত্তি রয়েছে। এসব আপত্তিতে জড়িত অর্থের পরিমাণ ১ লাখ ১৬ হাজার ২৩৩ কোটি টাকা।
তিনি বলেন, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ এবং অডিট অধিদপ্তর ঢাকায় হলেও বিপিসির প্রধান কার্যালয় অন্যত্র থাকায় হালনাগাদ তথ্য আদান-প্রদানে সমস্যা হচ্ছে। বিপিসির প্রধান কার্যালয় ঢাকায় স্থানান্তর করা হলে অডিট কার্যক্রম আরও কার্যকর এবং অনিয়ম প্রতিরোধ সহজ হবে।