
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি ও দীর্ঘ অচলাবস্থা কাটিয়ে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কার্গো জাহাজ ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’ সফলভাবে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে।
বিএসসি জানিয়েছে, জাহাজটির কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সাহসিকতা, দক্ষ নৌ-পরিচালনা এবং সরকারের উচ্চপর্যায়ের সার্বক্ষণিক তদারকির ফলে এ সাফল্য অর্জিত হয়েছে।
২০১৮ সালে নির্মিত ৩৮ হাজার ৮৯৪ ডিডব্লিউটি ধারণক্ষমতার বাল্ক ক্যারিয়ার জাহাজটি বর্তমানে নিরাপদ বাংকারিং ও প্রয়োজনীয় ক্লিয়ারেন্স প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরা বন্দরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। জাহাজটিতে কর্মরত ৩১ জন ক্রুর সবাই বাংলাদেশি। তারা সুস্থ ও নিরাপদ আছেন বলে জানিয়েছে বিএসসি।
সিঙ্গাপুরভিত্তিক একটি চার্টারারের অধীনে পরিচালিত জাহাজটি গত ২৬ জানুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় প্রবেশ করে। কাতারের মেসাইদ বন্দর থেকে ৩৯ হাজার টন স্টিল কয়েল নিয়ে এটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলী বন্দরে পৌঁছায়।
জাহাজটি জেবেল আলী বন্দরে অবস্থানকালে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ওই অঞ্চলে তীব্র সামরিক সংঘাত শুরু হয়। যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও ১১ মার্চ জাহাজটি সফলভাবে স্টিল কয়েলের কার্গো খালাস করে।
এরপর হরমুজ প্রণালি অতিক্রম অনিশ্চিত হয়ে পড়লে জাহাজটিকে সচল রাখা এবং চার্টারারের দৈনিক ভাড়া অব্যাহত রাখতে নতুন বাণিজ্যিক পরিকল্পনা নেয় বিএসসি। পরিকল্পনা অনুযায়ী জাহাজটিকে সৌদি আরবের রাস আল খায়ের বন্দরে পাঠানো হয়। সেখান থেকে প্রায় ৩৭ হাজার মেট্রিক টন সার বোঝাই করে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ টাউন ও ডারবান বন্দরের উদ্দেশে যাত্রার প্রস্তুতি নেওয়া হয়।
বিএসসি জানায়, দক্ষ বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপনার কারণে নতুন কার্গো বোঝাইয়ের সময় জাহাজটিকে একদিনের জন্যও ‘অফ-হায়ার’ হতে হয়নি। ফলে নিয়মিত ভাড়া পাওয়া অব্যাহত ছিল।
তবে সার বোঝাইয়ের পর হরমুজ প্রণালির অস্থিরতা ও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জাহাজটি ওই এলাকা ত্যাগ করতে পারেনি। গত ১৮ এপ্রিল ইরান নৌবাহিনী নিরাপত্তা ও কৌশলগত কারণ দেখিয়ে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজটির ট্রানজিটের অনুমতি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাখ্যান করে। এতে জাহাজটি দীর্ঘ সময় পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে আটকা পড়ে।
বিএসসির ভাষ্য, চলতি বছরের শুরু থেকে হরমুজ প্রণালি বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ ‘চোক পয়েন্টে’ পরিণত হয়েছে। যুদ্ধঝুঁকি বিমার প্রিমিয়াম বৃদ্ধি এবং বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধের মধ্যেও ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’র নিরাপদ ট্রানজিট দেশের সামুদ্রিক সক্ষমতার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
দীর্ঘ অচলাবস্থার সময় জাহাজের নাবিক ও ক্রু সদস্যদের মনোবল ধরে রাখতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়। জাহাজে সুপেয় পানি, খাদ্য, প্রয়োজনীয় রসদ ও জ্বালানির সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা হয়।
নাবিকদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য নিয়মিত সুযোগ-সুবিধার পাশাপাশি বিশেষ অনুমোদনে দৈনিক পাঁচ মার্কিন ডলার মিল অ্যালাউন্স, ঈদ উপলক্ষে বিশেষ প্রণোদনা এবং ‘ওয়ার ওয়েজ’ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে বিএসসি।
সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, সংকটকালীন সময়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিষয়টি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান এবং মন্ত্রণালয়ের সচিব জাকারিয়া ভিডিও কনফারেন্স ও টেলিফোনে জাহাজের ক্যাপ্টেন ও নাবিকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছেন।
জাহাজটি হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের সময় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও বিএসসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মেরিন ট্রাফিকের মাধ্যমে এর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করেন এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন।
বিএসসি মনে করে, সরকারের উচ্চপর্যায়ের তদারকি, প্রতিষ্ঠানের সংকট ব্যবস্থাপনা এবং জাহাজের ক্যাপ্টেন, চিফ ইঞ্জিনিয়ারসহ সব ক্রু সদস্যের সমন্বিত প্রচেষ্টায় সংকটটি সফলভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব হয়েছে।