
বিদেশি ঋণ গ্রহণে স্বচ্ছতা, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে জবাবদিহি এবং ব্যয় নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা।
মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগভিত্তিক মঞ্জুরি দাবির ওপর ছাঁটাই প্রস্তাবের আলোচনায় তারা এসব দাবি জানান।
অধিবেশনে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা ৫৯টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মঞ্জুরি দাবি উত্থাপন করেন। এর মধ্যে কয়েকটি ছাড়া বেশির ভাগ দাবির বিপরীতে বিরোধী দলের ৪৩ জন সদস্য মোট ১ হাজার ৪৩টি ছাঁটাই প্রস্তাব দেন।
তবে সব প্রস্তাবের ওপর আলোচনা হয়নি। কিছু মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ক্ষেত্রে আলোচনা না করার বিষয়ে বিরোধী দল আগেই সম্মত হয়েছিল। সময় বিবেচনায় কয়েকটি আলোচনার নোটিশও প্রত্যাহার করা হয়। বিরোধী দলের কোনো ছাঁটাই প্রস্তাবই গৃহীত হয়নি।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের মঞ্জুরি দাবির ওপর ছাঁটাই প্রস্তাব দিয়ে এনসিপির সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, এ বিভাগের মাধ্যমে সাধারণত বিদেশি ঋণ নেওয়া হয়। এসব ঋণের কিছু অংশ এমন প্রকল্পে ব্যবহৃত হয়েছে, যেখানে বড় ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। তবে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ কার্যকর তদারকি করতে পারেনি বলে দাবি করেন তিনি।
বিদেশি ঋণের শর্ত, পরিমাণ ও উৎস সংসদে প্রকাশের দাবি জানিয়ে আখতার হোসেন বলেন, ঋণের অর্থ যে প্রকল্পে ব্যবহার করা হবে, সেটি কতটা প্রয়োজনীয় এবং দেশ কতটা লাভবান হবে, তা যাচাই করা উচিত। দুর্নীতি প্রতিরোধেও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক মালয়েশিয়া ও চীন সফরে ঋণ নিয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে কি না, তা প্রকাশের দাবিও জানান তিনি।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের মঞ্জুরি দাবির ওপর আলোচনায় আখতার হোসেন বলেন, অতীতের বিভিন্ন আর্থিক কেলেঙ্কারিতে এ বিভাগের দুর্বলতা ও প্রশাসনিক ঘাটতি প্রকাশ পেয়েছে।
হল-মার্ক, জনতা ব্যাংক ও বেসিক ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এসব ঘটনায় আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কেউ জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। ঋণ পুনঃতফসিল এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কাজের দ্বৈততা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
পরিকল্পনা বিভাগের মঞ্জুরি দাবির ওপর ছাঁটাই প্রস্তাব দিয়ে খুলনা-২ আসনের সংসদ সদস্য শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন বলেন, অনেক প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে শেষ না হওয়ায় ব্যয় বেড়ে যায় এবং জনগণের অর্থের অপচয় হয়। বহু প্রকল্প বারবার সংশোধন করতে হয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
পরিকল্পনা প্রণয়নে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও দক্ষতা বাড়ানোর দাবি জানান শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন।
কুষ্টিয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. আমির হামজা প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা ও ব্যয় বৃদ্ধির প্রবণতা বন্ধের দাবি জানান। রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রকল্প গ্রহণ না করার আহ্বানও জানান তিনি।
বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের মঞ্জুরি দাবির ওপর ছাঁটাই প্রস্তাব দিয়ে রাজশাহী-৪ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল বারী সরদার বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্বের কারণ চিহ্নিত করে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। বারবার প্রকল্প সংশোধন ও ব্যয় বৃদ্ধিও নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন।
অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের মঞ্জুরি প্রস্তাবের আলোচনায় পিরোজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মাসুদ সাঈদী অভিযোগ করেন, করের আওতা বাড়ানোর নামে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করা হচ্ছে। সৎ করদাতারাও নিরীক্ষার নামে হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে দাবি করেন তিনি।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি
আইন মন্ত্রণালয়ের মঞ্জুরি দাবির ওপর ছাঁটাই প্রস্তাব দিয়ে সংসদ সদস্য আল ফারুক আবদুল লতিফ বলেন, নিম্ন আদালত পৃথক করা হলেও পদোন্নতি ও বদলিতে সরকারের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। ফলে বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান বলেন, দেশে ২৫ লাখের বেশি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। তিনি নতুন বিচারক নিয়োগ এবং বিভাগীয় শহরগুলোতে হাইকোর্টের বেঞ্চ স্থাপনের দাবি জানান।
বিচার বিভাগের বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি জানিয়ে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেন, সুষ্ঠু বিচার বিভাগ ছাড়া আইনের শাসন, ন্যায়বিচার এবং সবার জন্য সমান অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
ছাঁটাই প্রস্তাবের সমালোচনা করে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, বিরোধী দলের এক পক্ষ বরাদ্দ বেশি দাবি করে তা এক টাকায় নামানোর প্রস্তাব দিচ্ছে, অন্য পক্ষ বরাদ্দ কম হওয়ার অভিযোগ করেও একই প্রস্তাব দিচ্ছে।
তিনি বলেন, আইন বিভাগের বরাদ্দ এক টাকায় নামিয়ে আনা হলে বিচার বিভাগের প্রয়োজন থাকবে না এবং রাষ্ট্র পুলিশি ব্যবস্থার দিকে চলে যাবে।