
বিশেষ পুনঃতফসিল সুবিধা নেওয়ার পর আবার খেলাপি হয়ে পড়া ঋণগ্রহীতাদের জন্য সুদ মওকুফের সুযোগ বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন নির্দেশনায় ব্যাংকগুলোকে আরোপিত ও অনারোপিত-দুই ধরনের সুদ মওকুফের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
সোমবার জারি করা বাংলাদেশ ব্যাংকের এক সার্কুলারে এ সুবিধা দেওয়া হয়। এর ফলে সুদ মওকুফের আগে তহবিল ব্যয় আদায় নিশ্চিত করার আগের বাধ্যবাধকতা শিথিল হলো।
সার্কুলার অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বিশেষ পুনঃতফসিল সুবিধা পাওয়া ঋণগ্রহীতারাও নতুন সুদ মওকুফ সুবিধার আওতায় আসবেন।
নতুন নীতির অধীনে খেলাপি ঋণগ্রহীতারা শুধু ঋণের আসল অর্থ পরিশোধ করে এককালীন নিষ্পত্তির সুযোগ পেতে পারেন। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের অনুমোদন সাপেক্ষে তাদের আরোপিত ও অনারোপিত সুদ মওকুফ করা যাবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত খেলাপি ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলোর স্থগিত সুদ হিসাবে প্রায় এক লাখ কোটি টাকার অনারোপিত সুদ জমা ছিল।
এই সুদ মওকুফ করা হলে মোট খেলাপি ঋণের হার ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ থেকে প্রায় ২৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
স্থগিত সুদ হিসাব কী
কোনো ঋণ খেলাপি হয়ে গেলে তার অনাদায়ী সুদ ব্যাংক আয় হিসেবে দেখাতে পারে না। ওই সুদ লাভ-ক্ষতির হিসাবে যুক্ত না করে ‘স্থগিত সুদ হিসাব’ বা সাসপেন্স অ্যাকাউন্টে রাখা হয়।
এটি মূলত পাওনা হলেও এখনো আদায় হয়নি এবং আয় হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি-এমন সুদের হিসাব। নতুন নির্দেশনার মাধ্যমে এই হিসাবে থাকা সুদ মওকুফের নিয়ম শিথিল করা হয়েছে।
আসল ঋণ মওকুফের বিরোধিতা ব্যাংকগুলোর
সার্কুলার জারির আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান ব্যাংকগুলোর শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে ব্যাংকের ব্যালেন্স শিটে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমাতে আসল ঋণ ও সুদ মওকুফের বিকল্প নিয়ে আলোচনা হয়।
কয়েকজন ব্যাংক নির্বাহী জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি কমিটির অনুমোদনে পুনঃতফসিল করা অধিকাংশ ঋণ আবারও খেলাপি হয়ে পড়ায় এসব বিকল্প সামনে আনা হয়।
তবে ব্যাংকগুলো আসল বা মূল ঋণ মওকুফের প্রস্তাবের বিরোধিতা করে। তাদের মতে, মূল ঋণ মওকুফ করা ব্যাংক কোম্পানি আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
অন্যদিকে স্থগিত সুদ হিসাবে থাকা অনারোপিত সুদ মওকুফের প্রস্তাবে ব্যাংকগুলো সম্মতি দেয়। কারণ এ ধরনের সুদ ব্যাংকের অর্জিত আয় হিসেবে হিসাবভুক্ত হয়নি।
একজন ব্যাংক নির্বাহী জানান, আরোপিত সুদ মওকুফের আবেদন প্রতিটি ঋণের ক্ষেত্রে আলাদাভাবে বিবেচনা করা হবে। কারণ আগে আয় হিসেবে দেখানো সুদ মওকুফ করলে ২০২৬ সালে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের আয় সরাসরি কমতে পারে।
তিনি দাবি করেন, খেলাপি ঋণের হার কমাতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের চাপও নতুন নীতি গ্রহণের ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আইএমএফের সঙ্গে আলোচনার আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংক খেলাপি ঋণের হার কমিয়ে আনতে চাইছে বলে তার ধারণা।
ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ ১০ লাখ কোটি টাকার বেশি
২০২৫ সালের শেষে খেলাপি ঋণ, পুনঃতফসিল করা ঋণ ও অবলোপন করা ঋণসহ দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় ১০ লাখ ৮৭ হাজার কোটি টাকা।
এ অর্থ ব্যাংকিং খাতের মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৬০ শতাংশ।
নতুন নীতির মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর ব্যালেন্স শিট থেকে দীর্ঘদিনের অনাদায়ী সুদ বাদ দেওয়া এবং ঋণগ্রহীতাদের এককালীন নিষ্পত্তিতে উৎসাহিত করার চেষ্টা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
তবে ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করেন, সুদ মওকুফের মাধ্যমে কাগজে খেলাপি ঋণ কমলেও ব্যাংকিং খাতের মূল সমস্যা সমাধান হবে না।
‘আমানতকারীদের ঝুঁকি বাড়বে’
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ পদক্ষেপের সমালোচনা করেছেন।
তিনি বলেন, ব্যাংকের অর্থের মূল উৎস আমানতকারীদের টাকা। তাই ঋণগ্রহীতাদের সুদ মওকুফের সুযোগ দেওয়া আমানতকারীদের স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
তার মতে, খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের একের পর এক সুবিধা দেওয়া হলেও ঋণ পরিশোধের সংস্কৃতিতে প্রত্যাশিত উন্নতি হয়নি। নতুন সুবিধা ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের আরও উৎসাহিত করতে পারে বলেও আশঙ্কা করেন তিনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মুহাম্মদ এ রুমি আলী বলেন, ব্যাংকগুলো আগে আয় হিসেবে দেখানো সুদ মওকুফ করলে ভবিষ্যৎ বছরগুলোতে তাদের সেই ক্ষতি বহন করতে হবে।
তিনি বলেন, বড় খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রে বিপুল পরিমাণ আরোপিত সুদ মওকুফ করা হলে ব্যাংকের আয় ও মূলধন পরিস্থিতির ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
এতে বিশেষ করে আর্থিকভাবে দুর্বল ব্যাংকগুলোর সক্ষমতা ও স্থিতিশীলতা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত আমানতকারীরাও ঝুঁকিতে পড়তে পারেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
কর সমন্বয় নিয়ে অস্পষ্টতা
রুমি আলী সুদ মওকুফের কর-সংক্রান্ত প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
তার মতে, কিছু ব্যাংক আগে আয় হিসেবে দেখানো সুদের ওপর ইতোমধ্যে কর দিয়ে থাকতে পারে। পরে ওই সুদ মওকুফ করা হলে ব্যাংকগুলো কর সমন্বয় বা কোনো সুবিধা পাবে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক পূর্বানুমতি ছাড়াই সুদ মওকুফের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ব্যাংকগুলোর ওপর ছেড়ে দিয়েছে। এতে ব্যাংকগুলো নমনীয়তা পেলেও দুর্বল ব্যাংকের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বাড়তে পারে।
বড় ঋণখেলাপিদের আরও সুবিধা দেওয়ার আগে ঋণের অর্থে দেশে ও বিদেশে তৈরি করা তাদের সম্পদ শনাক্ত করে আইনি প্রক্রিয়ার আওতায় আনার পরামর্শও দেন তিনি।
ব্যাংকের মুনাফায় কী প্রভাব পড়বে
বেসরকারি একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী জানান, স্থগিত সুদ ব্যাংকের প্রকৃত আয় নয়। কারণ ওই অর্থ এখনো আদায় করা হয়নি।
স্থগিত সুদের বিপরীতে আগে থেকেই প্রয়োজনীয় প্রভিশন রাখা থাকলে সুদ মওকুফের পর মূলত সেই প্রভিশন সমন্বয় হবে। এতে ব্যাংকের মুনাফায় বড় প্রভাব না-ও পড়তে পারে।
তবে কোনো সুদ আগে আয় হিসেবে দেখানো হয়ে থাকলে এবং তার বিপরীতে প্রভিশন না থাকলে, তা মওকুফ করার কারণে ব্যাংকের মুনাফা কমে যাবে।
তিনি বলেন, ঋণগ্রহীতা ঋণ পরিশোধ না করলেও ব্যাংককে আমানতকারীর অর্থ ব্যবহারের খরচ পরিশোধ করতে হয়। এ কারণে অতিরিক্ত সুদ মওকুফ ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
তারপরও এককালীন নিষ্পত্তির মাধ্যমে দীর্ঘদিনের অনাদায়ী ঋণ হিসাব বন্ধ করা গেলে মোট শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ কমবে এবং ব্যাংক অন্তত আসল ঋণের একটি অংশ উদ্ধার করতে পারবে।
পুনঃতফসিল করা ঋণের ৪০ শতাংশ আবার খেলাপি
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে ব্যাংকগুলো দুই লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ পুনঃতফসিল করেছে। এর প্রায় ৪০ শতাংশ আবার খেলাপি হয়ে পড়েছে।
বেসরকারি একটি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী জানান, খেলাপি প্রতিষ্ঠানের মৌলিক সমস্যার সমাধান না করেই ঋণ পুনঃতফসিল করায় এসব ঋণ আবার খেলাপি হচ্ছে।
তার মতে, অনেক খেলাপি প্রতিষ্ঠানের ঋণ-ইকুইটি অনুপাত ১০০ শতাংশ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব মূলধন প্রায় ছিল না। এ অবস্থায় নতুন মূলধন জোগান, সম্পদ বিক্রি বা ব্যবসার পরিধি কমানোর পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও ঋণ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
ফলে তাদের ঋণের বোঝা আরও বেড়েছে এবং পুনঃতফসিলের পরও নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি।
তিনি জানান, তার ব্যাংক একটি ঋণ পুনঃতফসিলের ক্ষেত্রে গ্রাহককে সম্পদ বিক্রি, অতিরিক্ত জামানত দেওয়া এবং ব্যবসার পরিধি কমানোর শর্ত দিয়েছিল। এসব পদক্ষেপের পর প্রতিষ্ঠানটি আট বছরের জন্য ঋণ পুনঃতফসিল করে এখনো কিস্তি পরিশোধ করছে।
তার মতে, দীর্ঘ গ্রেস পিরিয়ড দিলে পরবর্তী সময়ে কিস্তির পরিমাণ বেড়ে যায়। ফলে ঋণগ্রহীতার ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে এবং ঋণ আবারও খেলাপি হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
কাঠামোগত সংস্কারের তাগিদ
ব্যাংকারদের মতে, বারবার ঋণ পুনঃতফসিল বা সুদ মওকুফ করে খেলাপি ঋণ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
সংকটাপন্ন ঋণ ও দীর্ঘমেয়াদি খেলাপি সম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্য একটি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি গঠনের পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
এ ধরনের প্রতিষ্ঠান ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ছাড়কৃত মূল্যে সংকটাপন্ন সম্পদ কিনে নিতে পারে। এতে ব্যাংকগুলো ব্যালেন্স শিট পরিষ্কার করার পাশাপাশি আর্থিক সক্ষমতা পুনর্গঠনের সুযোগ পাবে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, সুদ মওকুফের সুবিধার সঙ্গে কঠোর ঋণ আদায় ব্যবস্থা, খেলাপিদের সম্পদ শনাক্তকরণ এবং ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা না হলে নতুন নীতিও আগের পুনঃতফসিল কর্মসূচির মতো প্রত্যাশিত ফল নাও দিতে পারে।