
চট্টগ্রামে বৃষ্টির তীব্রতা কমলেও বন্যা পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। ভারতীয় পাহাড়ি ঢলের কারণে গত এক সপ্তাহ ধরে জেলার বাঁশখালী, সাতকানিয়া, ফটিকছড়ি, রাউজান, বোয়ালখালী, চন্দনাইশ, লোহাগাড়া, হাটহাজারী, আনোয়ারা, কর্ণফুলী ও পটিয়াসহ ১১ উপজেলার বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত রয়েছে।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় প্রায় ৭ লাখ ৫৯ হাজার মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। এক সপ্তাহ ধরে দুর্ভোগে থাকা এসব মানুষের মধ্যে শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। এ সময়ে পাহাড় ধস ও বন্যার পানিতে ভেসে চট্টগ্রামে ১১ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
চট্টগ্রাম আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, শনিবার (দিন উল্লেখ থাকলে যোগ করতে হবে) বেলা ৩টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ২৭ দশমিক ১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা গত এক সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন। তবে বৃষ্টি কমলেও ভারতের ত্রিপুরা ও মিজোরামের পাহাড়ি ঢলের কারণে প্লাবিত এলাকাগুলোতে পানি কমছে না।
বন্যাকবলিত দুর্গম এলাকাগুলোতে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চালাচ্ছে সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিসসহ বিভিন্ন সংস্থা। তবে দীর্ঘদিন বিদ্যুৎ না থাকায় অনেক এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে। এতে দুর্গম এলাকার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগে সমস্যায় পড়ছেন উদ্ধারকারী ও ত্রাণ বিতরণকারী দলগুলো।
সাতকানিয়ায় বন্যার প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে। উপজেলার ১৭টি ইউনিয়নের সবগুলোই কমবেশি পানিতে নিমজ্জিত রয়েছে। সাঙ্গু নদীর পানি শনিবারও বিপৎসীমার ১৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। কেরানীহাট-বান্দরবান মহাসড়কে এখনো যান চলাচল স্বাভাবিক হয়নি।
লোহাগাড়া উপজেলার সদর, আধুনগর, বড়হাতিয়া ও আমিরাবাদ ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকাও পানির নিচে রয়েছে।
বাঁশখালীর উপকূলীয় এলাকার অন্তত আটটি ইউনিয়নের মানুষ এখনো পানিবন্দি। ছনুয়া, বরগুনা, গন্ডামারা, সরল, পুঁইছড়ি, শেখেরখিল, বৈলছড়ি, বাহারছড়া, কাথরিয়া ও আলীপুর এলাকায় বন্যার পানি কমেনি। স্থানীয়দের দাবি, ভারতের ঢলের কারণে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়েছে।
বাঁশখালীতে ৮০টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু করা হলেও সেখানেও শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
পুঁইছড়ির বাসিন্দা কামাল হোসেন বলেন, “এর আগে কখনো এমন বন্যা দেখিনি। ঢলের পানিতে ফসল, গবাদি পশু, মাছের ঘের ও লবণের ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কয়েক দিন ধরে খাবার ও পানির সংকটে মানবেতর জীবনযাপন করছি।”
বৈলছড়ির বাসিন্দা কায়কোবাদ জানান, তার বসতঘর পানিতে ভেসে গেছে। বর্তমানে তিনি পরিবার নিয়ে অন্য একটি বাড়ির ছাদে আশ্রয় নিয়েছেন।
ফটিকছড়ি, আনোয়ারা, চন্দনাইশ ও বোয়ালখালী উপজেলাতেও কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মাসুদুল আলম জানান, বন্যায় জেলার ১৭৬টি ইউনিয়ন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যার পানিতে ভেসে যাওয়া ও পাহাড় ধস মিলিয়ে মহানগর ও জেলায় ১১ জন নিহত এবং ১২ জন আহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আপ্রু মারমা জানান, এবারের বন্যায় আউশ চাষ পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন পর্যন্ত ৯ হাজার ৪৩ হেক্টর আউশ, ৯৬০ হেক্টর আমন বীজতলা এবং ৫ হাজার ৯০৭ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন সবজি নষ্ট হয়েছে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগম জানান, বন্যায় প্রায় ৪০ কোটি টাকার মৎস্যসম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ আলমগীর জানান, প্রায় ২৮ কোটি টাকার প্রাণিসম্পদের ক্ষতি হয়েছে।
জেলা প্রশাসনের তথ্যানুযায়ী, মহানগরসহ জেলার ১৬ উপজেলায় এক লাখ ৮৮ হাজার ৬৪৮টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এদিকে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে মতবিনিময় শেষে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, চট্টগ্রামের দুর্যোগ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিয়মিত খোঁজখবর রাখছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী দুদিনের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
তিনি আরও বলেন, দুর্গম এলাকাগুলোতে শুরুতে ত্রাণ পৌঁছাতে কিছুটা সমস্যা হলেও সেনাবাহিনী মাঠে নামার পর পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। বাঁশখালীর বিভিন্ন এলাকায় চিংড়ি ঘেরের জন্য স্লুইচগেট বন্ধ রাখার অভিযোগ পাওয়া গিয়েছিল, সেগুলো খুলে দেওয়ার পর পানি দ্রুত নামছে।
ফটিকছড়ির বন্যা পরিস্থিতি পরিদর্শন শেষে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসাইন বলেন, দুর্যোগ শুরুর পর থেকেই প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রামের পরিস্থিতির খোঁজখবর রাখছেন এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে নির্দেশনা দিয়েছেন।