
গত জুন মাসে সারা দেশে সড়ক, রেল ও নৌপথে মোট ৫৯০টি দুর্ঘটনায় ৫১৩ জন নিহত এবং ১ হাজার ৩৩৬ জন আহত হয়েছেন। মঙ্গলবার বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির দুর্ঘটনা মনিটরিং সেল এ তথ্য জানিয়েছে।
সংগঠনটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুনে ৫৩২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৬৩ জন নিহত ও ১ হাজার ৩২৩ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে রেলপথে ৫৩টি দুর্ঘটনায় ৪৫ জন নিহত ও আটজন আহত এবং নৌপথে পাঁচটি দুর্ঘটনায় পাঁচজন নিহত ও পাঁচজন আহত হয়েছেন।
দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে বলে জানিয়েছে যাত্রী কল্যাণ সমিতি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুনে ১৭২টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৭৩ জন নিহত ও ১৩২ জন আহত হয়েছেন। মোট দুর্ঘটনার ৩২ দশমিক ৩৩ শতাংশ ছিল মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা। এসব দুর্ঘটনায় মোট নিহতের ৩৭ দশমিক ৩৬ শতাংশ এবং আহতের ৯ দশমিক ৯৭ শতাংশ ছিলেন।
বিভাগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রাম বিভাগে। সেখানে ১২৮টি দুর্ঘটনায় ১২৬ জন নিহত এবং ৩৭৩ জন আহত হয়েছেন। সবচেয়ে কম দুর্ঘটনা ঘটেছে ময়মনসিংহ বিভাগে। এ বিভাগে ২৫টি দুর্ঘটনায় ২৬ জন নিহত ও ৩৫ জন আহত হয়েছেন।
সংগঠনের মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী স্বাক্ষরিত বার্তায় বলা হয়েছে, সড়ক দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে ২২ জন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, ১১৬ জন চালক, ৮২ জন পথচারী, ২৯ জন পরিবহন শ্রমিক, ৮৭ জন শিক্ষার্থী, ১০ জন শিক্ষক, ৫২ জন নারী, ৫৫ জন শিশু, একজন সাংবাদিক, একজন প্রকৌশলী এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ১০ জন নেতাকর্মীর পরিচয় পাওয়া গেছে।
তাদের মধ্যে নিহত হয়েছেন দুই পুলিশ সদস্য, একজন সেনাসদস্য, একজন প্রকৌশলী, বিভিন্ন পরিবহনের ১১১ জন চালক, ৭১ জন পথচারী, ৪৫ জন নারী, ৪৭ জন শিশু, ৬০ জন শিক্ষার্থী, ১১ জন পরিবহন শ্রমিক, ১০ জন শিক্ষক এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নয়জন নেতাকর্মী।
জুনে সংঘটিত দুর্ঘটনায় ৭৯৫টি যানবাহন শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৬ দশমিক ৭৯ শতাংশ মোটরসাইকেল, ২৫ দশমিক ২৮ শতাংশ ট্রাক, পিকআপ, কাভার্ড ভ্যান ও লরি, ১৭ দশমিক ৩৫ শতাংশ বাস, ১৪ দশমিক ৯৬ শতাংশ ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক এবং ৫ দশমিক ২৮ শতাংশ সিএনজিচালিত অটোরিকশা।
এ ছাড়া দুর্ঘটনাকবলিত যানবাহনের মধ্যে ৪ দশমিক ১৫ শতাংশ নছিমন, করিমন, মাহিন্দ্রা, ট্রাক্টর ও লেগুনা এবং ৬ দশমিক ১৬ শতাংশ কার, জিপ ও মাইক্রোবাস ছিল।
দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে সংগঠনটি জানিয়েছে, মোট দুর্ঘটনার ৪৩ দশমিক ২৩ শতাংশ মুখোমুখি সংঘর্ষ, ২৭ দশমিক ৬৩ শতাংশ গাড়িচাপা বা ধাক্কার ঘটনা এবং ২০ দশমিক ৬৭ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে ঘটেছে।
এ ছাড়া ৭ দশমিক ১৪ শতাংশ দুর্ঘটনা অন্যান্য কারণে, শূন্য দশমিক ১৮ শতাংশ চাকায় ওড়না পেঁচিয়ে এবং ১ দশমিক ১২ শতাংশ ট্রেন ও যানবাহনের সংঘর্ষে ঘটেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোট দুর্ঘটনার ৪৪ দশমিক ৭৩ শতাংশ জাতীয় মহাসড়কে, ২৮ দশমিক ৩৮ শতাংশ আঞ্চলিক মহাসড়কে এবং ২০ দশমিক ৬৭ শতাংশ ফিডার রোডে ঘটেছে। এ ছাড়া ৪ দশমিক ১৩ শতাংশ দুর্ঘটনা ঢাকা মহানগরীতে, শূন্য দশমিক ৯৩ শতাংশ চট্টগ্রাম মহানগরীতে এবং ১ দশমিক ১২ শতাংশ রেলক্রসিংয়ে ঘটেছে।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষণে জুনের সড়ক দুর্ঘটনার উল্লেখযোগ্য কারণ হিসেবে জাতীয় মহাসড়কে মোটরসাইকেল, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অটোরিকশার অবাধ চলাচল, পর্যাপ্ত রোড সাইন, রোড মার্কিং ও সড়কবাতির অভাব এবং হঠাৎ ফিডার রোড থেকে যানবাহন মহাসড়কে উঠে আসার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া সড়কে মিডিয়ান বা রোড ডিভাইডার না থাকা, মহাসড়ক ও যানবাহনের ত্রুটি, ট্রাফিক আইন অমান্য, উল্টোপথে যানবাহন চলাচল, সড়কে চাঁদাবাজি এবং পণ্যবাহী যানে যাত্রী পরিবহনকে দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংগঠনটি।
অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, বেপরোয়া গাড়ি চালানো, বিরামহীনভাবে যানবাহন পরিচালনা এবং বৃষ্টির কারণে সড়কে গর্ত ও ভাঙাচোরা অবস্থাকেও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংগঠনটির দাবি, অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে নিম্ন আয়ের মানুষ বাস ও ট্রাকের ছাদ কিংবা পণ্যবোঝাই ট্রাকে যাতায়াত করতে বাধ্য হওয়ায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়েছে।