
আমার দেশ সম্পাদক ড. মাহমুদুর রহমান বলেছেন, হিন্দুধর্ম ও হিন্দুত্ববাদকে এক করে দেখার সুযোগ নেই। হিন্দুত্ববাদ একটি রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং এর মোকাবিলা সামরিক বা অর্থনৈতিকভাবে নয়, বরং রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে করতে হবে।
শনিবার সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর. সি. মজুমদার মিলনায়তনে দুটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বেদুইন প্রকাশনীর উদ্যোগে প্রকাশিত বই দুটি হলো এ. এম. আব্দুল্লাহ রচিত ‘বাংলাদেশে জুলাই বিপ্লব’ এবং সৈয়দ সাদাতুল্লাহ হুসাইনীর গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ ‘হিন্দুত্ববাদী চরমপন্থা: মতাদর্শগত দ্বন্দ্ব এবং মুসলমান’।
মাহমুদুর রহমান বলেন, “হিন্দুত্ববাদ আর হিন্দু এক বিষয় নয়। যেমন ইহুদি ও জায়োনিজম এক নয়, তেমনি হিন্দু ও হিন্দুত্ববাদও এক নয়। হিন্দুত্ববাদকে কেবল ধর্মীয় পরিচয় হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি একটি রাজনৈতিক মতাদর্শ।”
তিনি দাবি করেন, হিন্দুত্ববাদের রাজনৈতিক ভিত্তির সঙ্গে মুসলমানদের প্রতি বিদ্বেষের সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রতিবেশী ও দক্ষিণ এশিয়ার শক্তিশালী আঞ্চলিক রাষ্ট্র ভারতকে সামরিক শক্তি দিয়ে মোকাবিলা করা সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মাহমুদুর রহমান বলেন, “বাংলাদেশের মানুষ জ্ঞান, গবেষণা ও চিন্তাশক্তিতে এগিয়ে যেতে পারলে কোনো শক্তিই আমাদের দমিয়ে রাখতে পারবে না। ভারত ও হিন্দুত্ববাদকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবেই মোকাবিলা করতে হবে।”
মুসলিম বিশ্বের বর্তমান অবস্থার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জ্ঞানচর্চা, গবেষণা ও বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বে পিছিয়ে পড়ার কারণে মুসলমানরা বিশ্বে নেতৃত্ব হারিয়েছে। জ্বালানি সম্পদ থাকা সত্ত্বেও মুসলিম দেশগুলো এর কার্যকর ব্যবহার করতে পারেনি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, কোনো জাতিকে নেতৃত্ব দিতে হলে জ্ঞান, বাণিজ্য ও সামরিক সক্ষমতায় শক্তিশালী হতে হয়। মুসলমানদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিজেদের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।
‘বাংলাদেশে জুলাই বিপ্লব’ বইটি প্রসঙ্গে মাহমুদুর রহমান বলেন, বইটির নামই এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক। জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহকে কেউ আন্দোলন বা অভ্যুত্থান বললেও তিনি এটিকে বিপ্লব হিসেবে বিবেচনা করেন।
তার ভাষ্য, বিপ্লব মানে প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থা ভেঙে নতুন রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা। বিদ্যমান ক্ষমতার কাঠামো ধরে রাখতে আগ্রহী ব্যক্তিরা স্বাভাবিকভাবেই ‘বিপ্লব’ শব্দটি এড়িয়ে চলেন।
জুলাইয়ের ইতিহাস দ্রুত সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, মানুষের স্মৃতি সতেজ থাকার সময় ঘটনাগুলো লিপিবদ্ধ হলে ইতিহাস বিকৃতির সুযোগ কমে যায়। কেউ নিজের মতো করে ইতিহাস উপস্থাপন করলে তা সহজেই প্রশ্নের মুখে পড়বে।
বই পড়ার অভ্যাস কমে যাওয়াকে বড় সংকট উল্লেখ করে তিনি বলেন, মানুষ এখন মোবাইল ফোন, টেলিভিশন ও কম্পিউটারের পর্দায় বেশি সময় কাটাচ্ছে। বই পড়ার সংস্কৃতি কমে যাওয়ায় ইতিহাস বিকৃত হলেও অনেকের পক্ষে তা বোঝা বা প্রতিবাদ করা কঠিন হবে।
বই প্রকাশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট লেখক ও প্রকাশকদের প্রশংসা করে তিনি বলেন, একটি বই প্রকাশে শ্রম, সময় ও অর্থ ব্যয় হয়। সম্পাদনা, বানান সংশোধন, প্রচ্ছদ ও ছাপাসহ পুরো প্রক্রিয়াটি কঠিন। বাংলাদেশের ইতিহাস সংরক্ষণে এ ধরনের প্রকাশনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
‘হিন্দুত্ববাদী চরমপন্থা: মতাদর্শগত দ্বন্দ্ব এবং মুসলমান’ বইটি প্রসঙ্গে মাহমুদুর রহমান বলেন, বইটির লেখকের সব বক্তব্যের সঙ্গে তিনি একমত না হলেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাধর্মী ও একাডেমিক কাজ।
তিনি বলেন, “কোনো মতাদর্শকে মোকাবিলা করতে হলে প্রথমে সেটিকে বুঝতে হবে। আমরা প্রায়ই হিন্দুত্ববাদ শব্দটি ব্যবহার করি, কিন্তু এর ভিত্তি, বিকাশ ও বর্তমান চরিত্র নিয়ে খুব কম মানুষই চিন্তা করি।”
হিন্দুত্ববাদের ঐতিহাসিক পটভূমি বুঝতে ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধ, ব্রিটিশ শাসনের সূচনা, ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ, ১৯৪৭ সালের দেশভাগ এবং হিন্দু মহাসভার রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মাহমুদুর রহমান বলেন, ইতিহাস না জেনে কেবল স্লোগানের মাধ্যমে কোনো মতাদর্শ মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। এ জন্য পড়াশোনা, গবেষণা এবং যুক্তি ও তথ্যভিত্তিক অবস্থান তৈরি করতে হবে।
হিন্দুধর্মের সাংস্কৃতিক ও ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন দেব-দেবীকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। ধর্মীয় বিশ্বাস ও রাজনৈতিক মতাদর্শকে আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করলেই হিন্দুধর্ম ও হিন্দুত্ববাদের পার্থক্য বোঝা সম্ভব।
তরুণদের উদ্দেশে মাহমুদুর রহমান বলেন, “বিতর্ক করুন, প্রশ্ন করুন এবং গবেষণা করুন। কিন্তু না পড়ে কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন না। জ্ঞানচর্চাই একটি জাতির সবচেয়ে বড় শক্তি।”
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. শামছুল আলম এবং ইসলামী চিন্তাবিদ মুফতি আলী হোসেন ওসামা। সভাপতিত্ব করেন বেদুইন প্রকাশনীর প্রকাশক আনাস বিন মালেক।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন জুলাই আন্দোলনে চোখ হারানো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ডাকসুর আন্তর্জাতিক সম্পাদক খান জসিম। সমাপনী বক্তব্যে আনাস বিন মালেক সুস্থ ও প্রগতিশীল জ্ঞানচর্চায় বেদুইন প্রকাশনীর পাশে থাকার আহ্বান জানান।
পরে অতিথিরা ‘বাংলাদেশে জুলাই বিপ্লব’ এবং ‘হিন্দুত্ববাদী চরমপন্থা: মতাদর্শগত দ্বন্দ্ব এবং মুসলমান’ বই দুটির মোড়ক উন্মোচন করেন।