
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের চেতনা সমুন্নত রাখা এবং বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের কথিত ‘সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের’ বিপরীতে একটি শক্তিশালী বিকল্প বয়ান তৈরির আহ্বান জানিয়েছেন কবি, লেখক, নাট্যকার ও সংস্কৃতিজনেরা।
শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর পরিবাগে সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্রে আয়োজিত ‘অবরুদ্ধ সময়ের স্মৃতি ও কবিতা’ শীর্ষক স্মৃতিচারণ ও কবিতাপাঠের আসরে তারা এ আহ্বান জানান।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাহিত্য ও সংস্কৃতি সেলের মাসব্যাপী ‘দেশ গড়তে জুলাই জাগরণ’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোর অভিজ্ঞতা এবং বর্তমান প্রেক্ষাপটে সংস্কৃতির ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হয়।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব ও কোষাধ্যক্ষ এস এম সাইফ মোস্তাফিজ। স্বাগত বক্তব্য দেন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক ও স্লোগান রচয়িতা এবং এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব লুৎফর রহমান।
এনসিপির কেন্দ্রীয় সদস্য কবি সাইয়েদ জামিলের সঞ্চালনায় কবিতা পাঠ ও জুলাইয়ের স্মৃতিচারণ করেন কবি জাকির আবু জাফর, সালাহ উদ্দিন শুভ্র, রাসেল রায়হান, সাম্য শাহ, সানাউল্লাহ সাগর, মামুন সারোয়ার, গাজী রফিক, আসমা সুলতানা শাপলা, আবিদ আজম, শিবলী আহমেদ, ইমরান মাহফুজ ও জিয়া হকসহ অনেকে।
স্বাগত বক্তব্যে লুৎফর রহমান ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের শুরুর দিকের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ১৪ জুলাই রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার সময় আন্দোলনের নেতারা চানখাঁরপুলের ‘স্বপ্ন বিল্ডিং’-এ পরবর্তী কৌশল নির্ধারণ করছিলেন।
তার ভাষ্য, ওই বৈঠকে আসিফ মাহমুদ, নাহিদ ইসলাম, হাসিব আল ইসলাম ও রিফাত রশিদসহ আন্দোলনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। আন্দোলনের পোস্টার, কর্মসূচি ও যাতায়াতের খরচ মেটাতে শিক্ষার্থীরা নিজেদের মধ্যে চাঁদা সংগ্রহ করতেন বলেও জানান তিনি।
লুৎফর রহমান দাবি করেন, ওই রাতে মোটরসাইকেলের জ্বালানি ও আনুষঙ্গিক খরচের জন্য আবু বাকের মজুমদার ও নাহিদ ইসলাম তার কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা নিয়েছিলেন। এটিকে আন্দোলনের প্রাথমিক তহবিলের অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
জুলাই আন্দোলনে আলোচিত দুটি স্লোগান রচনার প্রেক্ষাপটও তুলে ধরেন লুৎফর রহমান। তিনি জানান, ‘লাখো শহীদের রক্তে কেনা, দেশটা কারও বাপের না’ স্লোগানটি তিনি রচনা করেছিলেন। বিগত সরকারের পরিবারতান্ত্রিক বয়ান ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রতিবাদ জানানোই এর উদ্দেশ্য ছিল বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি আরও জানান, ৫ সেপ্টেম্বর রাতে ‘আবু সাঈদ মুগ্ধ, শেষ হয়নি যুদ্ধ’ স্লোগানটিও তিনি তৈরি করেন।
মূল আলোচনায় এস এম সাইফ মোস্তাফিজ বিগত সরকারের ১৭ বছরের শাসনামলে কথিত ‘সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের’ রাজনৈতিক বিশ্লেষণ তুলে ধরেন।
তিনি অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ শুধু রাষ্ট্রীয় শাসন কাঠামোর মধ্যেই ফ্যাসিবাদ সীমাবদ্ধ রাখেনি; শিল্প ও সংস্কৃতির বিভিন্ন স্তরেও একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক কাঠামো প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিল।
উদাহরণ হিসেবে শিশুদের জন্য প্রকাশিত ‘মুজিব’ কমিকসের কথা উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, সেখানে একটি রাজনৈতিক চরিত্রকে অতিপ্রাকৃতিক বা সুপারহিরোর মতো উপস্থাপন করে শিশুদের মনস্তত্ত্ব প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয়েছিল।
‘জয় বাংলা কনসার্ট’-এর মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক চিন্তাধারায় প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হতো বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনই যথেষ্ট নয়; দেশের সাংস্কৃতিক ও মননশীল পরিসরেও রূপান্তর প্রয়োজন। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ধরে রাখতে তৃণমূল থেকে বৈষম্যহীন ও স্বৈরাচারবিরোধী সর্বজনীন সাংস্কৃতিক জাগরণ গড়ে তোলার আহ্বান জানান তারা।