
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো মূলত ভোক্তা, উৎপাদক নয়। ব্যক্তিগত ডাটা সুরক্ষা অধ্যাদেশ (পিডিপিও) এবং জাতীয় ডাটা গভর্ন্যান্স অধ্যাদেশ একটি আইনি ভিত্তি তৈরি করলেও এআই ব্যবস্থাপনায় দেশের প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি এখনো পর্যাপ্ত নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তাদের মতে, নীতি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষিত জনবল, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিং ব্যবস্থা এবং নিজস্ব ক্লাউড প্ল্যাটফর্মের ঘাটতি রয়েছে। এর সঙ্গে অবকাঠামোগত দুর্বলতা, ডাটা নিরাপত্তা এবং শ্রমবাজারে এআইয়ের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
ঝুঁকিভিত্তিক নীতিমালা
সরকারের প্রস্তাবিত এআই নীতিমালায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের এআই অ্যাক্টের আদলে ঝুঁকিভিত্তিক কাঠামো অনুসরণের কথা বলা হয়েছে। এতে এআইয়ের ব্যবহারকে নিষিদ্ধ, উচ্চ ঝুঁকি ও স্বল্প ঝুঁকিসহ কয়েকটি স্তরে ভাগ করার প্রস্তাব রয়েছে।
নীতিমালায় ইউনেস্কো, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (ওইসিডি) এবং আসিয়ানের নির্দেশিকা অন্তর্ভুক্ত থাকায় এটি আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাধীন ও প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ গঠন করা না হলে নীতিমালাটি কার্যকর করা কঠিন হবে। পূর্ণাঙ্গ আইনে রূপান্তরে বিলম্ব হলে দীর্ঘমেয়াদি আইনি শূন্যতাও তৈরি হতে পারে।
নাগরিকদের তথ্য সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগ
নাগরিকদের জাতীয় পরিচয়পত্র, স্মার্টকার্ড ও বায়োমেট্রিক তথ্যের নিরাপত্তা বড় উদ্বেগ হিসেবে দেখা দিয়েছে। অতীতে এনআইডি ডাটাবেজ থেকে তথ্য ফাঁসের অভিযোগ দেশের ডিজিটাল নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা সামনে এনেছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশের ৫২ শতাংশ ব্যাংক উচ্চ নিরাপত্তাঝুঁকির মধ্যে রয়েছে এবং প্রতিদিন গড়ে ৬৩০টি সাইবার হামলার চেষ্টা হচ্ছে। তবে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাবে আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা নিরীক্ষা ও নিয়মিত পেনিট্রেশন টেস্ট নিশ্চিত করা কঠিন হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ডিপফেক
প্রস্তাবিত নীতিমালায় রাজনৈতিক বক্তব্য, সমালোচনা কিংবা সাংবাদিকতাকে ‘এআই-ক্ষতিকর কনটেন্ট’ হিসেবে চিহ্নিত না করার কথা বলা হয়েছে। এটিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে ডিপফেক ও অপতথ্য প্রতিরোধসংক্রান্ত কিছু ধারার ভাষা অস্পষ্ট থাকলে ভবিষ্যতে তা ভিন্নমত দমনে ব্যবহৃত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সমালোচকেরা। তাই নীতিমালায় নাগরিক অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষার সুস্পষ্ট বিধান রাখার দাবি উঠেছে।
ফ্রিল্যান্সিং ও কর্মসংস্থানে প্রভাব
বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সিং ও গিগ অর্থনীতিতেও এআইয়ের প্রভাব দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। ডাটা এন্ট্রি ও ওয়েব স্ক্র্যাপিংয়ের মতো কাজ কমে যাওয়ায় অনেক ফ্রিল্যান্সার কাজ হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছেন।
নীতিমালায় দক্ষতা উন্নয়নের কথা বলা হলেও বাস্তবমুখী প্রশিক্ষণ ও সরকারি উদ্যোগ পর্যাপ্ত নয় বলে অভিযোগ রয়েছে। সময়মতো দক্ষতা রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া না হলে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান হুমকিতে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শিক্ষা ও শ্রমবাজারে বড় ঘাটতি
চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারি উদ্যোগে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। ডিজিটাল বৈষম্যও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শহরাঞ্চলে ৬৮ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করলেও গ্রামাঞ্চলে এ হার ৩৮ শতাংশ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সতর্কতার উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, অটোমেশনের কারণে তৈরি পোশাক খাতের ৬০ দশমিক ৮ শতাংশ বা প্রায় ২৭ লাখ শ্রমিকের চাকরি উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। ২০৪১ সাল নাগাদ এ সংখ্যা ৫৪ লাখে পৌঁছাতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রচলিত মুখস্থনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা আধুনিক এআইনির্ভর শ্রমবাজারের উপযোগী নয়। অষ্টম ও নবম শ্রেণি থেকে এআই শিক্ষা চালুর পরিকল্পনা থাকলেও দক্ষ শিক্ষক ও আধুনিক গবেষণাগারের অভাবে এর বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় রয়েছে।
স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থার দাবি
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ আরিফ মঈনুদ্দীন বলেন, বিশ্বজুড়ে এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ ঘটলেও বাংলাদেশ এখনো প্রস্তুতির প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। নতুন প্রযুক্তি গ্রহণে বাংলাদেশ দ্রুত হলেও তা নিরাপদ ও টেকসই করতে প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, প্রশিক্ষিত জনবল ও আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে।
তিনি বলেন, নাগরিকদের বিপুল পরিমাণ তথ্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সংরক্ষিত হলেও সমন্বিত ডাটা গভর্ন্যান্স, এনক্রিপশন এবং স্বাধীন নিরাপত্তা নিরীক্ষাব্যবস্থা এখনো যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। অতীতে এনআইডির মতো সংবেদনশীল তথ্য ফাঁসের ঘটনা জাতীয় ডাটা অবকাঠামোর দুর্বলতা তুলে ধরেছে।
প্রস্তাবিত জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নীতিমালাকে ইতিবাচক সূচনা উল্লেখ করে আরিফ মঈনুদ্দীন বলেন, এটি যেন কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে, সে জন্য স্বাধীন ও প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ গঠন জরুরি।
নীতিমালার অস্পষ্ট ভাষার কারণে নাগরিকদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও উদ্ভাবনী সক্ষমতা যেন বাধাগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়েও সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন তিনি। জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সিং ও গবেষণা খাতের বিকাশে সহায়ক কাঠামো তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন এই বিশেষজ্ঞ।
আরিফ মঈনুদ্দীন আরও বলেন, দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এআই, মেশিন লার্নিং ও সাইবার নিরাপত্তাবিষয়ক আধুনিক ও সমন্বিত পাঠ্যক্রমের ঘাটতি রয়েছে। ফলে বাংলাদেশ এখনো বিদেশি প্রযুক্তি ও পরামর্শকের ওপর নির্ভরশীল, যা দীর্ঘমেয়াদে ডাটা সার্বভৌমত্বের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের এআই নীতিমালা ২০২৬-২০৩০ একটি সময়োপযোগী উদ্যোগ। তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে শক্তিশালী অবকাঠামো নির্মাণ, সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং ডিজিটাল বৈষম্য কমানোর ওপর। এসব ক্ষেত্রে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে এআইনির্ভর প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সুফল সীমিত গোষ্ঠীর মধ্যে আটকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।