
বাংলাদেশকে বৈশ্বিকভাবে সংযুক্ত সেমিকন্ডাক্টর ও ডিপ-টেক উদ্ভাবনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে আগামী ২৫ ও ২৬ জুলাই ঢাকায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ‘ন্যাশনাল সেমিকন্ডাক্টর সিম্পোজিয়াম ও BEAR সামিট ২০২৬’।
শনিবার (২৫ জুলাই) সকাল ১০টায় ঢাকার নভোথিয়েটারে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রধান অতিথি হিসেবে দুই দিনব্যাপী এ আয়োজনের উদ্বোধন করবেন।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) রাজধানীর গুলশান ক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন এসব তথ্য জানান।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআইএ) এবং সিলিকন রিভার বাংলাদেশ কর্মসূচির অংশীদারত্বে এ সামিট আয়োজন করা হচ্ছে।
দুই দিনের এ আয়োজনে সরকারের নীতিনির্ধারক, বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের শীর্ষ নির্বাহী, গবেষক, উদ্যোক্তা, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি, বিনিয়োগকারী এবং প্রবাসী বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞরা অংশ নেবেন। বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি সেমিকন্ডাক্টর ও ডিপ-টেক কৌশল প্রণয়নে তারা মতামত ও অভিজ্ঞতা তুলে ধরবেন।
সংবাদ সম্মেলনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব বলেন, বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিই সমৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চাবিকাঠি। বাংলাদেশকে উচ্চপ্রযুক্তিতে সক্ষম দেশ হিসেবে গড়ে তোলা এবং গবেষণালব্ধ জ্ঞানকে বাণিজ্যিকভাবে কাজে লাগাতে মন্ত্রণালয় কাজ করছে।
তিনি বলেন, সামিটের প্রধান লক্ষ্য বাংলাদেশের সেমিকন্ডাক্টর, বায়োটেকনোলজি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবোটিকস শিল্পের বর্তমান অবস্থা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সম্ভাবনা তুলে ধরা।
দুই দিনের আয়োজনে বিভিন্ন প্রদর্শনীর মাধ্যমে বায়োটেকনোলজি, প্রকৌশল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবোটিকস খাতের প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন দর্শনার্থীদের সামনে উপস্থাপন করা হবে। পাশাপাশি গবেষক, শিক্ষক ও বিজ্ঞানমনস্ক ব্যক্তিদের অংশগ্রহণে ১১টি প্লেনারি সেশন অনুষ্ঠিত হবে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব জানান, জ্ঞানভিত্তিক ও উদ্ভাবননির্ভর অর্থনীতি গঠনে মন্ত্রণালয় ‘Science to Economy: Building a Market-Linked, Innovation-Driven Bangladesh’ শীর্ষক নতুন কৌশলগত রূপকল্প নিয়ে কাজ করছে।
এ রূপকল্প বাস্তবায়নে চারটি কৌশলগত স্তম্ভ নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রথমত, প্রাথমিক পর্যায় থেকে বিজ্ঞান অলিম্পিয়াডকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য ধারাবাহিক মানবসম্পদ কাঠামো তৈরি করা।
দ্বিতীয়ত, ‘রিসার্চ টু মার্কেট’ কর্মসূচির আওতায় গবেষণাকে শুধু প্রকাশনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে শিল্প ও বাজারে প্রয়োগযোগ্য পণ্য এবং সেবায় রূপান্তর করা।
তৃতীয়ত, ‘ইনোভেশন টু মার্কেট’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে সেপ্টেম্বরের শুরুতে প্রথমবারের মতো ‘বাংলাদেশ জাতীয় উদ্ভাবন মেলা ২০২৬’ আয়োজন করা হবে। পাশাপাশি ভার্চুয়াল হাই-টেক সায়েন্স সিটির মাধ্যমে উদ্ভাবকদের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
চতুর্থত, সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বায়োটেকনোলজি ও মহাকাশ গবেষণার মতো আধুনিক প্রযুক্তি খাতে দেশের সক্ষমতা বাড়ানো হবে।
সরকার, শিল্প খাত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাবিষয়ক গবেষণা এবং নীতিনির্ধারণের জন্য ‘ন্যাশনাল এআই ইনস্টিটিউট’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান সচিব।
‘বৈশ্বিক অংশীদারত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশের সেমিকন্ডাক্টর ভবিষ্যৎ নির্মাণ’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত সামিটে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি খাতের নেতারা বক্তব্য দেবেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন টেক্সাস ইনস্ট্রুমেন্টসের চিফ টেকনোলজি অফিসার ড. আহমেদ বাহাই এবং পারডু বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক দিমিত্রিওস পেরুলিস।
সাতটি কৌশলগত প্যানেল আলোচনায় সরকারের প্রতিনিধি, বিএসআইএর সদস্য প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশি ও আন্তর্জাতিক শিক্ষাবিদ, প্রবাসী বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞ এবং বিদেশি সেমিকন্ডাক্টর শিল্প সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন।
প্যানেল আলোচনায় সেমিকন্ডাক্টর খাতে দক্ষ জনবল উন্নয়ন, শিল্পের সহায়ক পরিবেশ গঠন, বৈশ্বিক অংশীদারত্ব, গবেষণা, উন্নত উৎপাদনব্যবস্থা, বাণিজ্যিকীকরণ এবং উদীয়মান ডিপ-টেক প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা হবে।
আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে গ্লোবালফাউন্ড্রিজ, এনএক্সপি, অ্যাপলাইড ম্যাটেরিয়ালস, স্যান্ডিস্ক, ক্রেডো এবং ভিয়েতনাম সেমিকন্ডাক্টর অ্যালায়েন্স অ্যান্ড পার্টনারশিপের প্রতিনিধিরা থাকবেন।
‘বাংলাদেশের ডিপ-টেক ভবিষ্যৎ’ প্রতিপাদ্যে সামিটের দ্বিতীয় দিনে ক্রেইস্ট ফেলোস রিসার্চ সিম্পোজিয়াম অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে দেশের উদীয়মান সেমিকন্ডাক্টর গবেষকেরা তাদের গবেষণাকর্ম উপস্থাপন করবেন।
সামিটের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত হবে ‘BEAR ইনোভেশন এক্সপো ২০২৬’। এতে শিক্ষার্থী ও স্টার্টআপ উদ্যোক্তাদের তৈরি সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস, স্বাস্থ্যসেবা প্রযুক্তি, ইন্টেলিজেন্ট সিস্টেমসহ বিভিন্ন ডিপ-টেক উদ্ভাবন প্রদর্শিত হবে। এক্সপোতে মোট ৩৫টি প্রদর্শনী স্টল থাকবে।
১১টি প্লেনারি সেশনে বৈশ্বিক অংশীদারত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশের সেমিকন্ডাক্টর খাতের ভবিষ্যৎ, সেমিকন্ডাক্টর ইকোসিস্টেম গঠন, বৈশ্বিক শিল্প নেতৃত্ব, ডিপ-টেকের সম্ভাবনা, প্রযুক্তির সমন্বয়, ভবিষ্যৎ শিল্প, প্রবাসী বিশেষজ্ঞদের ভূমিকা এবং ডিপ-টেক স্টার্টআপ নিয়ে আলোচনা হবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ, আইসিটি বিভাগ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ফকির মাহবুব এনাম এবং প্রধানমন্ত্রীর টেলিযোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি ও বিজ্ঞানবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ।
অনুষ্ঠানে বিশেষ বক্তব্য দেবেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন পারডু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও সিলিকন রিভার ইনিশিয়েটিভের চিফ আর্কিটেক্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ মোস্তফা হুসাইন এবং বিএসআইএর সভাপতি এম. এ. জাব্বার।
সংবাদ সম্মেলনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব দেশের সেমিকন্ডাক্টর, উচ্চপ্রযুক্তি, প্রকৌশল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবোটিকস খাতের নতুন সম্ভাবনা জনগণের সামনে তুলে ধরতে গণমাধ্যমকর্মীদের সহযোগিতা কামনা করেন।