
আধুনিক প্রশিক্ষণ, সহজ ঋণ, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং দেশি-বিদেশি বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে দেশের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্পের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম।
শনিবার (১ আগস্ট) টাঙ্গাইলে নবনির্মিত তাঁত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও বেসিক সেন্টারের উদ্বোধন শেষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, নতুন কেন্দ্রটি শুধু অবকাঠামো নয়; এটি দক্ষ তাঁতি, কারিগর ও উদ্যোক্তা তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করবে। এখানে আধুনিক তাঁত প্রযুক্তি, পরিবর্তিত ফ্যাশন, নতুন নকশা, পণ্যের মানোন্নয়ন, বাজার বিশ্লেষণ এবং ডিজিটাল বিপণন বিষয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
প্রশিক্ষণ শেষে অংশগ্রহণকারীদের শুধু সনদ দেওয়ার মধ্যে কার্যক্রম সীমাবদ্ধ থাকবে না জানিয়ে তিনি বলেন, দক্ষতা অনুযায়ী তাদের টেক্সটাইল, তৈরি পোশাক, নিটওয়্যার, স্পিনিং মিল ও সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ইন্টার্নশিপ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে। সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তাদের দেওয়া হবে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা।
টাঙ্গাইলের শাড়িকে বাংলাদেশের ঐতিহ্য, গর্ব ও আবেগের প্রতীক উল্লেখ করে শরীফুল আলম বলেন, তাঁতশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে শুধু ঐতিহ্য সংরক্ষণই যথেষ্ট নয়। পণ্যের নকশা, গুণগত মান, ব্র্যান্ডিং ও বিপণনব্যবস্থাতেও আধুনিকতা আনতে হবে।
‘এক গ্রাম, এক পণ্য—ফিরিয়ে আনব হারানো ঐতিহ্য’ ধারণার আলোকে টাঙ্গাইলের শাড়িসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী তাঁতপণ্য পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, জামদানি, টাঙ্গাইলের শাড়ি, বেনারসি, রেশমসহ দেশের বিভিন্ন তাঁতপণ্য বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও পরিচয় বহন করে। এসব পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে তুলে ধরতে তাঁতিদের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও ই-কমার্স ব্যবহারে দক্ষ করে তুলতে হবে।
দেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং বিদেশে বাংলাদেশের মিশনগুলোতে রপ্তানিযোগ্য তাঁত, বস্ত্র, পাট ও ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্য প্রদর্শনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
তাঁতপণ্য রপ্তানিতে স্থলবন্দর ব্যবহারের জটিলতা নিরসনে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করা হবে উল্লেখ করে শরীফুল আলম বলেন, রং, সুতা ও অন্যান্য কাঁচামাল আমদানির সুবিধা যাতে মধ্যস্বত্বভোগীদের বদলে প্রকৃত তাঁতিরা সরাসরি পান, সে বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তাঁতিদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুরক্ষা, সহজ শর্তে ঋণ, প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান ও বাজারসংযোগ নিশ্চিত করতেও সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে বলে জানান তিনি।
টাঙ্গাইলের দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা কটন মিল পুনরায় চালুর উদ্যোগ প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, মিলটি একসময় এ অঞ্চলের হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম কেন্দ্র ছিল। দেশি-বিদেশি কয়েকজন বিনিয়োগকারী ইতোমধ্যে মিলটি পরিদর্শন করেছেন। বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে দ্রুত এটি চালু করে স্থানীয় কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রাণচাঞ্চল্য ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, টাঙ্গাইলের তাঁতশিল্প এ অঞ্চলের মানুষের জীবন, জীবিকা, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটির মাধ্যমে তাঁতিরা আধুনিক জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করে পণ্যের মান ও বৈচিত্র্য বাড়াতে পারবেন।
তিনি বলেন, প্রশিক্ষণ, সহজ ঋণ, কাঁচামাল সংগ্রহ, আধুনিক প্রযুক্তি ও বাজারজাতকরণের সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে টাঙ্গাইলের তাঁতশিল্প আরও শক্তিশালী হবে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড ও স্থানীয় প্রশাসনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
অনুষ্ঠানে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিব শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী, বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের চেয়ারম্যান, টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।