জন্মের পর থেকেই মানুষ পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও রক্তের সম্পর্কের পরিচিত পরিমণ্ডলে বেড়ে ওঠে। কিন্তু জীবনের কোনো এক পর্যায়ে এমন একজন মানুষের আগমন ঘটে, যার সঙ্গে রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও তৈরি হয় গভীর মানসিক বন্ধন। জীবনের আনন্দ, বেদনা ও গোপন কথাগুলো তার কাছেই নির্দ্বিধায় প্রকাশ করা যায়। সামাজিক বাধ্যবাধকতা কিংবা জন্মসূত্র ছাড়াই গড়ে ওঠা এই সম্পর্কের নাম বন্ধুত্ব।
মানুষের তৈরি সম্পর্কগুলোর মধ্যে বন্ধুত্ব সম্ভবত সবচেয়ে স্বাধীন, স্বতঃস্ফূর্ত ও গভীর। আজ আগস্ট মাসের প্রথম রোববার। বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশে দিনটি বন্ধু দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে। বন্ধুত্বকে কোনো নির্দিষ্ট দিন বা তারিখে বেঁধে রাখা সম্ভব নয়। তারপরও দিনটি পুরোনো বন্ধুদের খোঁজ নেওয়া, স্মৃতি রোমন্থন, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং সম্পর্ককে নতুন করে ঝালিয়ে নেওয়ার একটি উপলক্ষ হয়ে উঠেছে।
বন্ধু দিবসের ইতিহাস নিয়ে একাধিক মত প্রচলিত রয়েছে। ধারণা করা হয়, যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৩০ সালে প্রথম বাণিজ্যিকভাবে দিবসটি পালনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। হলমার্ক কার্ডের প্রতিষ্ঠাতা হাওয়ার্ড হল ওই বছরের ২ আগস্টকে বন্ধু দিবস হিসেবে ঘোষণা করে বন্ধুদের মধ্যে শুভেচ্ছা কার্ড, ফুল ও উপহার বিনিময়ের প্রচার চালান। তবে ক্রেতাদের আগ্রহ কম থাকায় উদ্যোগটি খুব বেশি সফল হয়নি।
পরবর্তী সময়ে ১৯৩৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস আগস্ট মাসের প্রথম রোববারকে ‘জাতীয় বন্ধু দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এরপর ধীরে ধীরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিনটি ছড়িয়ে পড়ে। আরেকটি প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, ১৯৩৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের একটি ঘটনার প্রতিবাদে বন্ধুর মৃত্যুর পরদিন এক ব্যক্তি আত্মহত্যা করেন। তাদের বন্ধুত্ব ও আত্মত্যাগের স্মরণে আগস্টের প্রথম রোববার বন্ধু দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলে অনেকে মনে করেন।
বন্ধু দিবসকে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত করতে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ প্যারাগুয়েও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ১৯৫৮ সালে দেশটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধু দিবস উদ্যাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দিবসটি পালনের প্রস্তাবও প্যারাগুয়ে থেকে এসেছিল। পরে ২০১১ সালের ২৭ জুলাই জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ প্রতিবছর ৩০ জুলাইকে ‘আন্তর্জাতিক বন্ধু দিবস’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। তবে বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশে এখনো আগস্টের প্রথম রোববারই বন্ধু দিবস উদ্যাপন করা হয়।
যুগে যুগে বিভিন্ন লেখক, দার্শনিক ও বিজ্ঞানীর বক্তব্যেও বন্ধুত্বের গভীরতা উঠে এসেছে। গল্পকার মারিও পুজো বন্ধুত্বকে প্রতিভার চেয়ে বড় এবং পরিবারের প্রায় সমতুল্য বলে মনে করতেন। আলবার্ট আইনস্টাইনের মতে, সত্যিকারের ভালোবাসা যেমন দুর্লভ, খাঁটি বন্ধুত্ব তার চেয়েও বিরল। রবার্ট লুইস স্টিভেনসন ও আলবেয়ার কামুর মতো চিন্তাবিদেরা বন্ধুত্বকে শর্ত ও নেতৃত্বের ঊর্ধ্বে পাশাপাশি চলার সম্পর্ক হিসেবে দেখেছেন। এরিস্টটলের দৃষ্টিতে, একজন বন্ধু মানুষের নিজেরই আরেক সত্তা।
সময় বদলের সঙ্গে বন্ধু দিবস উদ্যাপনের ধরনও পরিবর্তিত হয়েছে। একসময় শুভেচ্ছা কার্ড, চকলেট, ফুল কিংবা ছোট উপহার বিনিময়ের প্রচলন ছিল। এখন সেই জায়গার বড় অংশ দখল করেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। পুরোনো ছবির কোলাজ, একসঙ্গে কাটানো সময়ের স্মৃতিচারণ, বন্ধুদের উদ্দেশে শুভেচ্ছাবার্তা কিংবা আড্ডার ছবি প্রকাশ করে অনেকেই দিনটি উদ্যাপন করেন। তবে অনলাইন শুভেচ্ছার পাশাপাশি সরাসরি দেখা করা বা ফোন করে খোঁজ নেওয়ার আবেদন এখনো আলাদা।
মনোবিশ্লেষকদের মতে, বন্ধুত্ব শুধু বন্ধুদের সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ নয়। বাবা-মা ও সন্তানের সম্পর্ক কিংবা দাম্পত্য জীবনেও বন্ধুত্ব থাকলে পারস্পরিক বোঝাপড়া, আস্থা ও বিশ্বাস আরও গভীর হয়। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ তাজুল ইসলাম বলেন, আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা মানুষকে ধীরে ধীরে একাকী করে তুলছে। এই বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি কাটিয়ে উঠতে আন্তরিক বন্ধুত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তার মতে, বন্ধুহীন মানুষ বিভিন্ন মানসিক সমস্যায় ভুগতে পারেন। প্রত্যেক মানুষের জীবনে এমন একজন প্রয়োজন, যার কাছে নির্দ্বিধায় নিজের কথা বলা যায় এবং যিনি বন্ধুর সমস্যাকে নিজের সমস্যা হিসেবে দেখেন। এমন সম্পর্ক মানুষকে একাকিত্ব থেকে বেরিয়ে আসতে এবং মানসিকভাবে সুস্থ থাকতে সহায়তা করে।
বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখতে নিয়মিত যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ। ব্যস্ততার কারণে প্রতিদিন কথা বলা সম্ভব না হলেও মাঝেমধ্যে বন্ধুর খোঁজ নেওয়া, তার কথা মন দিয়ে শোনা এবং অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। ছোট একটি বার্তা কিংবা হঠাৎ করা ফোনও বন্ধুকে বুঝিয়ে দিতে পারে, তিনি এখনো আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
বন্ধুর জন্মদিন, নতুন অর্জন কিংবা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলো মনে রাখলে সম্পর্ক আরও আন্তরিক হয়। পুরোনো ছবি, স্মৃতি ও একসঙ্গে কাটানো সময়ের গল্প ভাগ করে নেওয়াও বন্ধুত্বকে প্রাণবন্ত করে। সত্যিকারের বন্ধুত্ব শুধু আনন্দের সময় একসঙ্গে থাকার নাম নয়; কঠিন সময়ে বন্ধুর পাশে দাঁড়ানোই এই সম্পর্কের বড় পরীক্ষা। সমস্যা সমাধান করা সম্ভব না হলেও মন দিয়ে কথা শোনা, সাহস দেওয়া ও মানসিক সমর্থন জানানো অনেক বড় সহায়তা হতে পারে।
বন্ধুত্ব ধরে রাখতে সব সময় বড় আয়োজনের প্রয়োজন হয় না। হঠাৎ খোঁজ নেওয়া, বন্ধুর পছন্দ মনে রাখা, ছোট উপহার দেওয়া কিংবা কিছু সময় একসঙ্গে কাটানোর মধ্য দিয়েও ভালোবাসা প্রকাশ করা যায়। প্রত্যেক মানুষের চিন্তা, পছন্দ, মতামত ও জীবনযাপনের ধরন আলাদা। বন্ধুত্বের সৌন্দর্য হলো এই ভিন্নতাকে গ্রহণ করা। মতের অমিল হলেও বন্ধুর প্রতি সম্মান বজায় রাখা একটি পরিণত সম্পর্কের পরিচয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দূরের বন্ধুদের কাছাকাছি রাখলেও বন্ধুত্ব শুধু লাইক, কমেন্ট ও বার্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। সুযোগ পেলে দেখা করা, সরাসরি কথা বলা এবং বাস্তব মুহূর্ত ভাগ করে নেওয়া সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করে। একই সঙ্গে বন্ধুর ব্যক্তিগত কথা গোপন রাখা, তার দুর্বলতাকে সম্মান করা এবং প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়ানো বন্ধুত্বের ভিত্তিকে মজবুত করে।
জীবনে মানুষের আসা-যাওয়া চলতেই থাকে। সময়ের সঙ্গে অনেক সম্পর্ক ফিকে হয়ে যায়, কেউ কেউ হারিয়ে যায় স্মৃতির অতলে। কিন্তু সত্যিকারের বন্ধুরা জীবনের শেষ পর্যন্ত থেকে যায়—কখনো পাশে, কখনো দূরে, আবার কখনো একরাশ মধুর স্মৃতি হয়ে। বন্ধুত্ব কোনো এক দিনের উদ্যাপন নয়; এটি প্রতিদিনের ছোট ছোট যত্ন, বিশ্বাস, সম্মান ও আন্তরিকতায় গড়ে ওঠা সম্পর্ক। আগস্টের প্রথম রোববার হোক কিংবা জাতিসংঘ ঘোষিত ৩০ জুলাই—বন্ধুত্ব প্রতিদিনের, বন্ধুত্ব চিরকালের।