
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ২ আগস্ট ছিল আন্দোলনের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ দিন। জুমার নামাজের পর রাজধানীসহ সারা দেশে ছাত্র-জনতার গণমিছিল, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং নাগরিক সমাজের সরাসরি অংশগ্রহণে আন্দোলন নতুন গতি পায়।
রাজধানীতে জাতীয় প্রেস ক্লাব থেকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ‘দ্রোহযাত্রা’ ছিল দিনটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি। একই রাতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ৩ আগস্ট দেশব্যাপী বিক্ষোভ এবং ৪ আগস্ট থেকে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণা দেয়।
দিনটি শুক্রবার হওয়ায় জুমার নামাজের পর থেকেই ঢাকা, সিলেট, খুলনা, চট্টগ্রাম, নরসিংদী, নোয়াখালী ও টাঙ্গাইলসহ বিভিন্ন শহরে হাজারো মানুষ রাজপথে নেমে আসেন। রাজধানীর সায়েন্স ল্যাব, মিরপুর-১০ ও আফতাবনগরে সড়ক অবরোধ করেন আন্দোলনকারীরা। টাঙ্গাইলে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করেন।
জাতীয় প্রেস ক্লাব থেকে শুরু হওয়া ‘দ্রোহযাত্রা’য় শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষক, সাংস্কৃতিক কর্মী, অভিভাবক, লেখক, শিল্পী, অধিকারকর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। পথে পথে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে মিছিলের পরিধি আরও বাড়তে থাকে।
বিক্ষোভকারীদের হাতে ‘স্টেপ ডাউন হাসিনা’, ‘ছাত্র হত্যার বিচার চাই’ এবং ‘গুলিতে মরতে পারি, পিছু হটব না’—এমন বিভিন্ন স্লোগানসংবলিত প্ল্যাকার্ড ছিল। তারা গণগ্রেপ্তার বন্ধ, নিহতদের বিচার, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মুক্তি, কারফিউ প্রত্যাহার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া এবং সরকারের পদত্যাগের দাবি জানান।
দ্রোহযাত্রা শুরুর আগে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘যারা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত, তাদের বিচার করতে হবে। এই হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে। আমাদের প্রধান আলোচ্য বিষয়, গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে হবে।’
পরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আয়োজিত সমাবেশ থেকে আন্দোলন আরও বেগবান করার আহ্বান জানানো হয়।
একই দিন ‘পোয়েটস অ্যান্ড রাইটারস অ্যাগেইনস্ট কান্ট্রিওয়াইড অ্যারেস্টস অ্যান্ড অপ্রেশন’ ও ‘প্রতিবাদ মঞ্চ’সহ বিভিন্ন ব্যানারে লেখক, কবি, প্রকাশক, শিক্ষক, চিকিৎসক ও মেডিকেল শিক্ষার্থীরা পৃথক কর্মসূচি পালন করেন। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬২৬ জন শিক্ষকও আন্দোলনের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন। এতে আন্দোলন শিক্ষার্থীদের গণ্ডি ছাড়িয়ে নাগরিক সমাজের বৃহত্তর অংশের সমর্থন পেতে শুরু করে।
রাজধানীর বাইরে সবচেয়ে তীব্র সংঘর্ষ হয় সিলেটে। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক থেকে বের হওয়া মিছিলে পুলিশ বাধা দিলে আখালিয়া, মদিনা মার্কেট, পাঠানটুলা ও বাগবাড়ী এলাকায় সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে।
পুলিশ টিয়ার শেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও শটগানের গুলি ছোড়ে। এতে শিক্ষার্থী, পথচারী শিশু ও সাংবাদিক আহত হন। স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন এলাকার নারী-পুরুষ শিক্ষার্থীদের আশ্রয় ও সহযোগিতা দিয়ে প্রতিরোধে অংশ নেন।
রাজধানীর উত্তরা, চট্টগ্রাম, হবিগঞ্জ ও খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানেও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, হবিগঞ্জে এক শ্রমিক এবং খুলনায় এক পুলিশ সদস্য নিহত হন। রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় সংঘর্ষে অন্তত দেড় শতাধিক মানুষ আহত হন।
দিনটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নতুন কর্মসূচি ঘোষণা। আন্দোলনের সমন্বয়কেরা রাতে জানান, ৩ আগস্ট সারা দেশে বিক্ষোভ মিছিল এবং ৪ আগস্ট থেকে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন পালন করা হবে।
তাদের নয় দফা দাবির মধ্যে ছিল হত্যাকাণ্ডের বিচার, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মুক্তি এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষমা প্রার্থনা। অসহযোগ কর্মসূচির অংশ হিসেবে কর, গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ না করা এবং সরকারি কার্যক্রম বর্জনের আহ্বানও জানানো হয়।
এর এক দিন আগে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হেফাজত থেকে মুক্তি পাওয়া ছয় সমন্বয়ক আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। তারা অভিযোগ করেন, ডিবি কার্যালয়ে আন্দোলন প্রত্যাহারের যে বিবৃতি প্রচার করা হয়েছিল, সেটি স্বেচ্ছায় দেওয়া হয়নি।
এদিন আন্তর্জাতিক মহল থেকেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। বাংলাদেশ সফর শেষে ইউনিসেফের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক আঞ্চলিক পরিচালক সঞ্জয় উইজেসেকেরা জানান, জুলাইয়ের সহিংসতায় অন্তত ৩২ শিশু নিহত হয়েছে। একই সময়ে দেশজুড়ে চলমান গ্রেপ্তার অভিযানে ১০ হাজারের বেশি মানুষ আটকের তথ্যও সামনে আসে।
দেশব্যাপী গণমিছিল, সংঘর্ষ, নাগরিক সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণায় ২ আগস্ট জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হয়ে ওঠে।