
দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলে আসছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঘটনা নয়; এটি রাষ্ট্র পুনর্গঠনেরও অঙ্গীকার। জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত সরকারের দায়িত্ব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন গড়ে তোলা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করা।
এই লক্ষ্য সামনে রেখে গত কয়েক মাসে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সংস্কার ও শুদ্ধি কার্যক্রম শুরু করেছে সরকার। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, প্রশাসনিক সংস্কার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পুনর্বিন্যাস, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং অতীতে বিতর্কিত ভূমিকা পালনকারী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমে একটি নিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এর অংশ হিসেবে ২০১৮ সালের বিতর্কিত ‘রাতের ভোটে’ দায়িত্ব পালনকারী ৩২ জন সাবেক জেলা প্রশাসক, যারা বর্তমানে যুগ্ম সচিব পদে ছিলেন, এবং বিভিন্ন পর্যায়ের মোট ৮০ জন জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে গেছেন সাহাবুদ্দিন চুপ্পু। সরকারের রাজনৈতিক মহলে তার পদত্যাগকে রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরে ফ্যাসিবাদমুক্ত প্রশাসন গঠনের বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এর মাধ্যমে অতীতের স্বৈরাচারী শাসনের সঙ্গে সম্পৃক্ত বা বিতর্কিত ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে বহাল না রাখার অবস্থান স্পষ্ট করেছে সরকার।
গত মাসে সংসদ অধিবেশনে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আবদুল বারী জানিয়েছিলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রশাসনের যেসব কর্মকর্তা প্রকাশ্যে সরকারকে দীর্ঘস্থায়ী করতে কাজ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে, তাদের চিহ্নিত করতে বিভিন্ন তদন্ত সংস্থা কাজ করছে। তদন্ত শেষে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
তিনি জানান, ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সরকারি চাকরিতে ১৪ লাখ ৬৪ হাজার ৩৫০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত ছিলেন এবং ৫ লাখ ২১ হাজার ৯২২টি পদ শূন্য ছিল। সচিব ও সিনিয়র সচিবের ৬৯টি পদের বিপরীতে ৬৭ জন, অতিরিক্ত সচিবের ৩৬৮টি পদের বিপরীতে ৩৭৮ জন, যুগ্ম সচিবের ১ হাজার ১১৬টি পদের বিপরীতে ৮৯৩ জন এবং উপসচিবের ২ হাজার ২৪৫টি পদের বিপরীতে ২ হাজার ৯৪০ জন কর্মরত রয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ২০১৮ সালের নির্বাচনে দায়িত্ব পালনের কারণেই সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক ও যুগ্ম সচিবদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে—সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এমন কোনো বক্তব্য দেয়নি। সরকারি চাকরির বিধান অনুযায়ী চাকরির বয়স ২৫ বছর পূর্ণ হলে সরকার জনস্বার্থে কোনো কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানো ছাড়াই অবসরে পাঠাতে পারে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও সেই বিধান প্রয়োগ করা হয়েছে।
তবে তিনি মন্তব্য করেন, ২০১৮ সালের নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ওই নির্বাচন নিয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের পাশাপাশি জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, নির্বাচনি কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং নির্বাচনি অপরাধে জড়িত অন্য ব্যক্তিদের ভূমিকাও অনুসন্ধান করা উচিত। প্রয়োজনে জড়িতদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে বলেও তিনি জানান। একই সঙ্গে ২০০৮, ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচন নিয়ে নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি।
গত ২৭ জুলাই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে ২০১৮ সালের নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনকারী ৩২ জন সাবেক জেলা প্রশাসককে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত জানানো হয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের ভূমিকা ধাপে ধাপে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এর আগে একই প্রক্রিয়ায় আরও ২২ জন সাবেক জেলা প্রশাসককে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছিল।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে গুলি চালানোর নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ ওঠা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের ভূমিকাও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক-৯ নাসির উদ্দীন সারোয়ারকে গত ৪ জুলাই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়।
প্রশাসনের পাশাপাশি পুলিশ বাহিনীতেও বড় ধরনের পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। গত ২৩ জুলাই তিনজন ডিআইজি, ১২ জন অতিরিক্ত ডিআইজি এবং দুজন পুলিশ সুপারসহ মোট ১৭ জন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৪৫ ধারা অনুযায়ী জনস্বার্থে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়।
এর আগে জুনে ১৪ জন ডিআইজি, ১৮ জন অতিরিক্ত ডিআইজি ও একজন পুলিশ সুপারসহ ৩৩ জনকে অবসরে পাঠানো হয়েছিল। এ ছাড়া গত ৩ মে ১৭ জন এবং ২২ এপ্রিল ১১ জন ডিআইজি ও দুজন অতিরিক্ত ডিআইজিকে একই আইনে অবসরে পাঠানো হয়। সব মিলিয়ে বর্তমান সরকারের পাঁচ মাসে ৮০ জন জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা বাধ্যতামূলক অবসরে গেছেন।
সরকারের ভাষ্য, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও পেশাদার, নিরপেক্ষ ও জনগণমুখী করতেই এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রীয় চাকরিতে রাজনৈতিক আনুগত্য নয়, দক্ষতা, পেশাদারত্ব ও দায়িত্বশীলতাই মূল্যায়নের প্রধান মানদণ্ড হবে।
এদিকে গত ১৬ জুলাই চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে সাবেক সেনা কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোজাফফর হোসেনকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ। হত্যাকাণ্ডের সময় তিনি সেনাবাহিনীর মেজর ছিলেন। ঘটনার পর তিনি পালিয়ে যান এবং তাকে ধরিয়ে দিতে পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়েছিল।
বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর গুমের ঘটনায় গত ২৮ জুলাই বিমানবাহিনীর উইং কমান্ডার সাইফুর রহমানকে হেফাজতে নেয় বিমানবাহিনী। এর আগে ২১ জুন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শতাধিক গুম-খুনের মামলায় সেনাবাহিনীর ওয়ারেন্ট অফিসার ইমরুল কায়েসের জবানবন্দিতে ওই কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠে আসে। জুলাই বিপ্লবের সময় ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালানোর অভিযোগে কয়েকজন কর্মকর্তার বিচারও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চলছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে পুলিশ প্রশাসনে বিভিন্ন ধাপে দুই শতাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগে কয়েকশ আমলাকে অবসরে পাঠানো হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় গত ১২ ফেব্রুয়ারি বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর শতাধিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
সরকারসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় সুবিধাপ্রাপ্ত এবং বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িত বলে চিহ্নিত কর্মকর্তাদের কার্যক্রম পর্যালোচনা করা হচ্ছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থায় তদন্ত ও মূল্যায়ন কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। নীতিনির্ধারকদের মতে, রাষ্ট্রযন্ত্রকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করে একটি নিরপেক্ষ, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন প্রতিষ্ঠাই সরকারের মূল লক্ষ্য। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে শতাধিক কর্মকর্তার কর্মকাণ্ড নিবিড় নজরদারিতে রয়েছে।
সূত্র: আমার দেশ