
কূটনৈতিক সম্পর্কে টানাপোড়েন চললেও বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়িয়েছে ভারতের আদানি পাওয়ার।
দুই দেশের সরকারি নথির বরাতে বুধবার এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ভারত ও বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে অবনতি ঘটতে থাকে, যার প্রভাব পড়ে দুই দেশের বিদ্যুৎ কেনাবেচার বাণিজ্যেও। অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত প্যানেলের পক্ষ থেকে বলা হয়, বাংলাদেশে আদানি যে বিদ্যুৎ সরবরাহ করেছে, তার দাম স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে বকেয়া অর্থ না পেলে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধের হুঁশিয়ারি দেয় আদানি।
পরবর্তী সময়ে সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ না করলেও ভারতীয় কোম্পানিটি বিদ্যুৎ সরবরাহ কমিয়ে দেয়। অন্যদিকে, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে 'ধীরে ধীরে' বকেয়া পরিশোধের খবর আসে। এমন পরিস্থিতিতেই আদানির পক্ষ থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানোর খবর এল।
দুই দেশের সরকারি নথির বরাতে রয়টার্স জানায়, ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় ঝাড়খণ্ড রাজ্যের গোড্ডা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ২০২৫ সালের শেষ তিন মাসে বাংলাদেশে আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২৫ কোটি কিলোওয়াট-ঘণ্টা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৮ শতাংশ বেশি।
২০২৩ সালের শুরুতে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করে আদানি। এর মধ্যে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে অবনতি ঘটলেও বিদ্যুতের কেনাবেচা বেড়েছে। কূটনৈতিক টানাপোড়েনের অংশ হিসেবে দুই দেশই ভিসা সেবা স্থগিত করেছে। এমনকি বিভিন্ন সময়ে একে অপরের কূটনীতিকদের তলব করার ঘটনাও ঘটেছে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম রয়টার্সকে বলেন, প্রাকৃতিক গ্যাসসহ বিদ্যুৎ উৎপাদনের জ্বালানির ঘাটতি মোকাবিলা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, ''চলতি বছর বিদ্যুতের চাহিদা ৬ থেকে ৭ শতাংশ বাড়তে পারে। এসব সামাল দিতে বিদ্যুৎ আমদানি প্রয়োজন।'' তিনি আরও বলেন, ''গ্যাসের ঘাটতি পুষিয়ে নিতে এ বছর দেশীয় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর জন্য বাংলাদেশ কয়লা আমদানি বাড়াবে।''
বিশ্লেষণ সংস্থা কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে কয়লা আমদানি ৩৫ শতাংশ বেড়ে রেকর্ড ১ কোটি ৭৩ লাখ ৪ হাজার টনে পৌঁছেছে। শিল্প বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থানীয় গ্যাস উৎপাদন দ্রুত কমে যাওয়া এবং এলএনজি সঞ্চালন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে বাংলাদেশ গ্যাস সংকটে পড়েছে।
বাংলাদেশ সরকারের তথ্য অনুযায়ী, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন গত বছর রেকর্ড পরিমাণে কমে দাঁড়িয়েছে ৪২ দশমিক ৬ শতাংশে। অথচ ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এক দশকে মোট বিদ্যুতের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই আসত গ্যাস থেকে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আদানি পাওয়ার মূলত এই ঘাটতি পূরণ করছে। ২০২৫ সালে তারা বাংলাদেশে রেকর্ড ৮৬৩ কোটি কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ করেছে, যা মোট বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রায় ৮২ শতাংশ। একই সময়ে ভারতের অন্যান্য কোম্পানি থেকে বিদ্যুৎ আমদানি সামান্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭০ লাখ ৯২ হাজার কিলোওয়াট-ঘণ্টা। বাংলাদেশের পাওয়ার গ্রিডের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারির প্রথম ২৭ দিনে মোট বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রায় ১০ শতাংশ এসেছে আদানির কাছ থেকে।
বাংলাদেশের জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ইজাজ হোসেন বলেন, ''সংকটের কারণে বাংলাদেশকে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ব্যবহার করতে হচ্ছে। আর তেলভিত্তিক বিদ্যুতের তুলনায় আদানির বিদ্যুৎ এখনো সস্তা।''