নীলফামারীর সৈয়দপুরে পেট্রোল ছিটিয়ে আগুন দেওয়ার ঘটনায় দগ্ধ হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আফাজ উদ্দিন (৬২) নামে এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় তিন দিনেও মামলা গ্রহণ না করার অভিযোগ তুলে নিহতের মরদেহ নিয়ে থানা ঘেরাও, বিক্ষোভ মিছিল ও সড়ক অবরোধ করেছেন স্বজন ও এলাকাবাসী।
সোমবার (৮ জুন) বেলা সাড়ে ১২টার দিকে উপজেলার খাতামধুপুর ইউনিয়নের কাচারীপাড়া এলাকা থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে শতাধিক মানুষ আফাজ উদ্দিনের মরদেহ নিয়ে সৈয়দপুর শহরে প্রবেশ করেন। পরে বিক্ষোভ মিছিল শেষে তারা সৈয়দপুর থানার প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান নেন এবং শেরে বাংলা সড়ক অবরোধ করেন।
এতে সৈয়দপুর-নীলফামারী মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সড়কের দুই পাশে যানবাহন আটকা পড়ে এবং থানা এলাকায় উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। প্রায় দুই ঘণ্টা পর পুলিশ এজাহার নথিভুক্ত করলেও বিক্ষুব্ধরা অবরোধ প্রত্যাহার করেননি।
এ সময় তারা সৈয়দপুর থানার ওসির অপসারণ দাবি করে বিক্ষোভ অব্যাহত রাখেন। প্রায় তিন ঘণ্টা থানা চত্বর ও আশপাশের এলাকায় উত্তেজনাকর পরিস্থিতি বিরাজ করে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত বুধবার ভোররাত ৪টার দিকে খাতামধুপুর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাচারীপাড়ায় আফাজ উদ্দিনের বড় ছেলে নুর হোসেনের নির্মাণাধীন বাড়িতে দুর্বৃত্তরা পেট্রোল ছিটিয়ে আগুন দেয়। ঘটনার সময় নুর হোসেন সেখানে না থাকলেও ভবনে অবস্থান করা তার বাবা আফাজ উদ্দিন আগুনে দগ্ধ হন।
গুরুতর আহত অবস্থায় প্রথমে তাকে সৈয়দপুর ১০০ শয্যা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে একই দিন তাকে ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চার দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর গত শনিবার দুপুর ১টার দিকে তিনি মারা যান।
নিহতের ছোট ছেলে আবু বকর সিদ্দিক অভিযোগ করে বলেন, প্রায় পাঁচ মাস আগে গাছের ঝরা পাতা কুড়ানোকে কেন্দ্র করে একই ইউনিয়নের মাঝাপাড়া এলাকার আব্দুল জব্বারের ছেলে আব্দুস সালাম চঞ্চলের সঙ্গে তাদের বিরোধ তৈরি হয়। ওই সময় চঞ্চল তার বড় ভাইকে মারধর করে এবং মোবাইল ফোন ভেঙে দেয় বলে দাবি করেন তিনি।
তার অভিযোগ, ওই ঘটনার জের ধরে গত ৩ জুন রাতে তারাগঞ্জ বাজারে তার ভাইকে আটকিয়ে মারধর করা হয়। পরে প্রতিশোধ নিতে চঞ্চল ও তার পরিবারের সদস্যরা নুর হোসেনকে হত্যার উদ্দেশ্যে নির্মাণাধীন ঘরে পেট্রোল ছিটিয়ে আগুন দেয়। তবে নুর হোসেন সেখানে না থাকায় তার বাবা আফাজ উদ্দিন দগ্ধ হন।
আবু বকর সিদ্দিক আরও অভিযোগ করেন, “বাবা ঢাকার বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। আমরা থানায় অভিযোগ দিলেও তিন দিনেও মামলা নেওয়া হয়নি। উল্টো ৬ লাখ টাকার বিনিময়ে বিষয়টি মীমাংসার জন্য চাপ দেওয়া হয়েছে। বাধ্য হয়েই আমরা লাশ নিয়ে থানায় এসেছি। আমরা এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই।”
অভিযোগের বিষয়ে সৈয়দপুর থানার ওসি রেজাউল করিম রেজা বলেন, ঘটনার পরপরই পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও তদন্ত করেছে। তবে আহত ব্যক্তির চিকিৎসা নিয়ে ব্যস্ত থাকায় পরিবারের পক্ষ থেকে কেউ লিখিত অভিযোগ দিতে আসেননি।
তিনি বলেন, পরে একটি এজাহার জমা দেওয়া হলেও তাতে কিছু ত্রুটি থাকায় সংশোধনের পরামর্শ দেওয়া হয়। পুলিশ নিজেরাই এজাহার সংশোধন করে দিতে চাইলেও তারা রাজি হননি। সোমবার সকালে আসতে বলা হলেও তারা মরদেহ ও লোকজন নিয়ে থানায় এসে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে তোলেন।
ওসি আরও জানান, ইতোমধ্যে মামলা নথিভুক্ত করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে অভিযুক্ত পক্ষ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, পূর্বশত্রুতার জেরে তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানির চেষ্টা করা হচ্ছে। ঘটনার কোনো প্রত্যক্ষদর্শী নেই এবং এতে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলেও দাবি করেন তারা।
তাদের ভাষ্য, একটি স্বার্থান্বেষী মহল ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করছে। সুষ্ঠু তদন্ত হলে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটিত হবে বলে দাবি অভিযুক্ত পক্ষের।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। আপনিই প্রথম মন্তব্য করুন!
আপনার মতামত দিন