বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) ২০২৬ সালের ১২ এপ্রিল রূপসী রাইস অ্যান্ড পুষ্টি মিলস লিমিটেডকে ২৫ কোটি ৫৭ লাখ টাকার একটি কাজ দেয়। এর প্রায় দুই মাস আগেই স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন মীর শাহে আলম।
চুক্তিসংক্রান্ত নথি অনুযায়ী, বগুড়াভিত্তিক রূপসী রাইস অ্যান্ড পুষ্টি মিলসের শতভাগ শেয়ারের মালিক শাহে আলম ও তার ছেলে মীর শাকরুল আলম সীমান্ত।
তবে ওই দরপত্রের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল শাহে আলম প্রতিমন্ত্রী হওয়ার আগে। সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনের মাত্র দুই দিন আগে, ২০২৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি খাবার লবণে আয়োডিন যুক্ত করতে পটাশিয়াম আয়োডেট কেনার জন্য দরপত্রটি প্রকাশ করে বিসিক।
সে সময় শাহে আলম বিসিকের পরিচালক ছিলেন। ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় দুই মাস পর ২০২৪ সালের ২ অক্টোবর ব্যবসায়ী ও বগুড়া জেলা বিএনপির সহসভাপতি শাহে আলমকে বিসিকের পরিচালক করা হয়। চলতি বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিনি ওই দায়িত্বে ছিলেন।
একাধিক চুক্তির নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে রূপসী রাইস অ্যান্ড পুষ্টি মিলস এবং শাহে আলমের ছেলের মালিকানাধীন মীর সীমান্ত ইঞ্জিনিয়ারিং বিসিক ও স্থানীয় সরকার বিভাগের কাছ থেকে ৭১ কোটি টাকার বেশি মূল্যের অন্তত ১২টি কাজ পেয়েছে।
এর মধ্যে শাহে আলম বিসিকের পরিচালক থাকাকালে প্রায় ৫৭ কোটি ৫০ লাখ টাকার ছয়টি এবং এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী হওয়ার পর আরও প্রায় ১৩ কোটি ৫০ লাখ টাকার ছয়টি কাজ দেওয়া হয়। মোট ১২টি চুক্তির দুটি পেয়েছে রূপসী রাইস অ্যান্ড পুষ্টি মিলস এবং বাকি ১০টি পেয়েছে মীর সীমান্ত ইঞ্জিনিয়ারিং।
এ নিয়ে স্বার্থের দ্বন্দ্বের প্রশ্ন তুলেছেন সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার। দ্য ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, ‘এটা তো স্পষ্টতই স্বার্থের দ্বন্দ্ব। শুধু সন্তান নয়, কোনো মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা অন্য যেকোনো কর্মকর্তার পরিবারের সদস্য বা স্বজনদেরও তার কর্তৃত্বাধীন সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে দূরে থাকা উচিত।’
ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক এই উপদেষ্টা আরও বলেন, অতীতের সরকারগুলোর সময় এ ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতি ব্যাপকভাবে দেখা গেছে। তথ্যগুলো সঠিক হলে দুর্নীতি দমন কমিশনের বিষয়টি খতিয়ে দেখা উচিত বলেও মত দেন তিনি।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দুটি সূত্রের দাবি, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিভিন্ন সরকারি কাজের চুক্তি পেতে শাহে আলম তদবির করেছিলেন।
সংবিধানের ১৪৭(৩) অনুচ্ছেদে লাভজনক পদ ও মুনাফালাভের উদ্দেশ্যে পরিচালিত কোম্পানি, সমিতি বা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনায় নির্দিষ্ট পদধারীদের অংশগ্রহণের বিষয়ে বিধিনিষেধ রয়েছে।
তবে এসব চুক্তিতে কোনো ধরনের স্বার্থের দ্বন্দ্ব থাকার কথা অস্বীকার করেছেন শাহে আলম। একই সঙ্গে নিজের সরকারি পদ ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠান নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও প্রত্যাখ্যান করেছেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রীর দাবি, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার আগেই তার ছেলের প্রতিষ্ঠান স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পগুলোর কাজ পেয়েছিল। তবে কোনো মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর নিকটাত্মীয়ের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ওই মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাজ করতে পারে কি না—এ প্রশ্নের সরাসরি উত্তর পাওয়া যায়নি।
সাবেক সচিব আব্দুল আওয়াল মজুমদারের মতে, মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর সন্তান নিজের মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক রাখলে স্বার্থের দ্বন্দ্বের প্রশ্ন ওঠে। উচ্চপদে থেকে সরকারি কাজ পাওয়ার ঘটনায় যেন পুরো সরকার প্রশ্নের মুখে না পড়ে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক থাকা উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মন্ত্রণালয়ে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ
প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর শাহে আলমকে ঘিরে আরও কয়েকটি ঘটনায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে।
গত ২৪ মার্চ আব্দুর রশীদ মিয়াকে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে এক বছরের চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, শাহে আলমের প্রভাবেই ওই নিয়োগ হয়েছিল। বর্তমান রাষ্ট্রপতি এবং তৎকালীন এলজিআরডি মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও বিষয়টি জানতেন না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
এলজিইডিতে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী থাকার সময় আব্দুর রশীদের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। নিয়োগের পাঁচ দিনের মাথায় তার নিয়োগ বাতিল করা হয়।
মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা দ্য ডেইলি স্টারের কাছে দাবি করেন, শাহে আলমের প্রভাব এতটাই ছিল যে মন্ত্রীকে না জানিয়েই এলজিইডির প্রধান নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সাধারণত মন্ত্রীর অনুমোদন ছাড়া জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে এমন চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি হওয়ার কথা নয়।
একাধিক কর্মকর্তার দাবি, শাহে আলমের প্রভাব শুধু নিজের মন্ত্রণালয়েই সীমাবদ্ধ নয়। জনপ্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে পদায়ন ও বদলিতেও তার ভূমিকা নিয়ে সচিবালয়ে আলোচনা রয়েছে।
সরকারি প্যাড ব্যবহার করে একটি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ডেমি-অফিশিয়াল (ডিও) চিঠি দেওয়ার ঘটনাও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
গত ১ জুলাই চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের সদরঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ শরীফের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেন শাহে আলম। এর এক সপ্তাহের মধ্যেই ওই ওসিকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
প্রতিমন্ত্রীর প্রভাব নিয়ে সচিবালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন দায়িত্বশীল সচিব দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, রাষ্ট্রপতি থাকাকালে জিয়াউর রহমান পরিবারের সদস্যদের সরকারি কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখার নীতি কঠোরভাবে অনুসরণ করতেন। তার আদর্শে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের নেতাদেরও সেই নীতি অনুসরণ করা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
যা বলছেন শাহে আলম
৩১ আগস্ট সচিবালয়ে নিজ কার্যালয়ে দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।
শিবগঞ্জ পৌরসভার উন্নয়নকাজের দরপত্র তার ছেলের প্রতিষ্ঠান পাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, কাজটি তার সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী হওয়ার আগেই পাওয়া হয়েছিল। পরে নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড ও কার্যাদেশ হওয়ার পর স্বার্থের দ্বন্দ্ব এড়াতে হলফনামার মাধ্যমে কাজটি অন্য এক ঠিকাদারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
নতুন করে দরপত্র আহ্বান করলে এলাকার উন্নয়নকাজ বাধাগ্রস্ত হতো বলেও দাবি করেন তিনি।
শাহে আলমের ভাষ্য, এরপর থেকে তার ছেলে কোনো পৌরসভা বা অন্য প্রতিষ্ঠানের দরপত্রে অংশ নেননি। তিনি যতদিন প্রতিমন্ত্রী বা সরকারি কোনো পদে থাকবেন, ততদিন তার ছেলে ঠিকাদারি ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা রাখেন না বলেও জানান।
স্বার্থের দ্বন্দ্বের অভিযোগ প্রসঙ্গে শাহে আলম বলেন, সরকারি দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই ছেলের প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব অন্য ব্যক্তির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তাই বিষয়টি স্বার্থের দ্বন্দ্বের আওতায় পড়ে বলে তিনি মনে করেন না।
তবে হলফনামার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব অন্য ব্যক্তির কাছে হস্তান্তর করলে মালিকানাও পরিবর্তিত হয় কি না—এ প্রশ্নের উত্তর দেননি তিনি।
বিসিকের পরিচালক থাকা অবস্থায় নিজের পরিবারের প্রতিষ্ঠান কাজ পাওয়ার প্রসঙ্গেও কোনো অনিয়ম হয়নি বলে দাবি করেন শাহে আলম।
তার ভাষ্য, বিসিকে তিনি বোর্ড সদস্য ছিলেন এবং বোর্ড সদস্যদের নির্বাহী ক্ষমতা নেই। তিনি ক্রয় কর্মকর্তা ছিলেন না, দরপত্র আহ্বান বা অনুমোদন দেননি এবং অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়াতেও যুক্ত ছিলেন না।
তার পরিবারের কোনো প্রতিষ্ঠান বিসিকের কাজ করলেও সেটিকে স্বার্থের দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখেন না বলে জানান শাহে আলম। তার দাবি, কর্তৃপক্ষ নিয়ম ও বিধিবিধান অনুসরণ করেই দরপত্র, কার্যাদেশ ও অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে এবং বহিরাগত বোর্ড সদস্য হিসেবে এতে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তার ছিল না।
চট্টগ্রামের পুলিশ কর্মকর্তাকে বদলির অনুরোধ জানিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো ডিও চিঠির বিষয়ে জানতে চাইলে শাহে আলম বলেন, ‘আমি এসব বিষয়ে আর কথা বলব না।’
তথ্যসূত্র : দ্য ডেইলি স্টার





