যশোরের চৌগাছায় ছাত্রশিবিরের দুই নেতাকে গ্রেপ্তারের পর ‘বন্দুকযুদ্ধের’ ঘটনা সাজিয়ে গুলি করার অভিযোগে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন এক সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই)। জবানবন্দিতে তিনি দাবি করেছেন, ঘটনার সময় উপস্থিত না থাকলেও পরবর্তী মামলায় তাকে আহত হিসেবে দেখানো হয়েছিল।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১–এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। প্যানেলের অপর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
এ মামলায় তৎকালীন যশোরের পুলিশ সুপার (এসপি) আনিসুর রহমানসহ মোট আটজন আসামি রয়েছেন। তাদের মধ্যে তিনজন গ্রেপ্তার এবং বাকিরা পলাতক।
গ্রেপ্তার আসামিরা হলেন চৌগাছা থানার তৎকালীন এসআই আকিকুল ইসলাম, কনস্টেবল সাজ্জাদুর রহমান ও কনস্টেবল জহরুল হক। মঙ্গলবার তারা ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত ছিলেন।
এসপি আনিসুর রহমান ছাড়া পলাতক অন্য আসামিরা হলেন চৌগাছা থানার তৎকালীন ওসি মশিউর রহমান এবং এসআই মোখলেছ, জামাল ও মাজেদুল।
মামলার তৃতীয় সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেওয়া ৫১ বছর বয়সী ওই এএসআই বর্তমানে সাতক্ষীরার পাটকেলঘাটা থানায় কর্মরত। তিনি ২০১৬ সালের জুলাই থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত চৌগাছা থানায় দায়িত্ব পালন করেন। নিরাপত্তার কারণে তার নাম প্রকাশ করা হয়নি।
সাক্ষ্যে তিনি বলেন, ২০১৬ সালের ৩ আগস্ট বিকেল সাড়ে ৩টা থেকে সাড়ে ৪টার মধ্যে বিশেষ অভিযানের অংশ হিসেবে তিনি, এসআই মোখলেছ, আকিকুল ও মাজেদুলসহ একটি দল নারায়ণপুর এলাকায় একটি ফাঁকা সড়কে চেকপোস্ট বসান।
এ সময় একটি মোটরসাইকেলে আসা দুই ব্যক্তিকে থামানো হয়। তাদের কাছে থাকা একটি শপিং ব্যাগে ইসলামী ছাত্রশিবিরের চাঁদা আদায়ের রশিদ ও রেজিস্টার খাতা পাওয়া যায় বলে জানান সাক্ষী। জিজ্ঞাসাবাদে তারা নিজেদের ইসরাফিল ও রুহুল আমিন বলে পরিচয় দেন।
সাক্ষীর ভাষ্য, এরপর এসআই মোখলেছ বিষয়টি ফোনে তৎকালীন ওসি মশিউর রহমানকে জানান। ওসির নির্দেশে দুজনকে থানায় নেওয়া হয়। একজনকে মোখলেছের মোটরসাইকেলে এবং অন্যজনকে মাজেদুলের মোটরসাইকেলে নেওয়া হয়। আটক ব্যক্তিদের মোটরসাইকেলও থানায় নেওয়া হয়েছিল।
তিনি বলেন, দুজনকে ডিউটি অফিসারের কক্ষে রেখে তিনি থানা এলাকায় নিজের ভাড়া বাসায় চলে যান। পরদিন ৪ আগস্ট সকাল সাড়ে ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে থানায় এলেও তার ডিউটি না থাকায় কিছুক্ষণ পর আবার বাসায় ফিরে যান।
সাক্ষী দাবি করেন, ৫ আগস্ট সকালে থানায় গিয়ে তিনি জানতে পারেন, ৩ আগস্ট আটক করা ওই দুই ব্যক্তিকে আগের দিন চৌগাছার বন্দুলিতলা এলাকায় পায়ে বন্দুক ঠেকিয়ে গুলি করা হয়েছে।
তার দাবি অনুযায়ী, কনস্টেবল সাজ্জাদুর রহমান ও জহরুল হক ওই দুজনকে গুলি করেন এবং এসআই মোখলেছ তাদের বিরুদ্ধে দুটি ‘সাজানো’ মামলা করেন।
এএসআই আরও দাবি করেন, ওই মামলায় তাকেও সঙ্গীয় কর্মকর্তা হিসেবে আহত দেখানো হয় এবং উল্লেখ করা হয় যে তিনি চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিয়েছেন। অথচ ঘটনার সময় তিনি নিজের বাসায় ছিলেন এবং কোনোভাবেই আহত হননি।
জবানবন্দিতে তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে এসআই মোখলেছের কাছে জানতে চাইলে তাকে বলা হয়, তৎকালীন এসপি আনিসুর রহমান ও ওসি মশিউর রহমান বিষয়টি জানেন এবং তাকে নীরব থাকতে হবে।
পরবর্তী সময়ে এসআই জামাল তাকে ওই মামলার সাক্ষী দেখিয়ে অভিযোগপত্র দাখিল করেন বলেও দাবি করেন তিনি। তবে মামলার বিষয়ে জামাল কখনো তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেননি বলে জানান সাক্ষী।
জবানবন্দিতে ওই পুলিশ কর্মকর্তা আরও দাবি করেন, চৌগাছা থানায় কর্মরত থাকার সময় তিনি জানতে পারেন যে তৎকালীন সরকারের বিরোধিতা করার কারণে যশোর জেলায় প্রায় অর্ধশত তরুণকে গুলি করে পঙ্গু করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, বিবেকের তাড়নায় তিনি ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিতে এসেছেন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে পুলিশ বাহিনীকে ব্যবহার করে এ ধরনের ঘটনা যেন আর না ঘটে, সে জন্য সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের শাস্তি চান তিনি।
জবানবন্দি শেষে তাকে জেরা করেন পলাতক পাঁচজন ও উপস্থিত দুই আসামির আইনজীবী মনজুর আলম।
ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম ও আবদুস সাত্তার পালোয়ান। তাদের সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম, মার্জিনা রায়হান, তাসমিরুল ইসলাম, মঈনুল করিমসহ অন্যরা।





