বাংলাদেশের রাজনীতিতে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে আলোচিত ও প্রভাবশালী এক নাম বেগম খালেদা জিয়া। গৃহবধূ থেকে রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের রাজপথ থেকে তিনবার সরকার পরিচালনা—দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে তিনি দেশের রাজনীতির কেন্দ্রীয় চরিত্রে পরিণত হন।
আজ ১৫ আগস্ট প্রয়াত বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মদিন। এবারের দিনটি তাকে ছাড়াই পালন করছেন দলের নেতাকর্মীরা। শোক, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও দোয়ার মধ্য দিয়ে তাকে স্মরণ করছেন বিএনপির অনুসারীসহ অনেকেই।
খালেদা জিয়ার সক্রিয় রাজনীতিতে আসার পেছনে ছিল এক আকস্মিক ট্র্যাজেডি। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর একদল বিপথগামী সদস্যের হাতে নিহত হন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তার মৃত্যুর পর বিএনপির ভেতরে নেতৃত্বের সংকট তৈরি হয়। সেই পরিস্থিতিতেই ধীরে ধীরে রাজনীতিতে যুক্ত হন তার স্ত্রী খালেদা জিয়া।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে জিয়া পরিবারের উত্থান অবশ্য শুরু হয়েছিল আরও আগে। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক ও সামরিক অস্থিরতার সময় সামনে আসেন মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার জিয়াউর রহমান। ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহের পর তিনি রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে আসেন এবং পরে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারণাকে সামনে রেখে রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলার উদ্যোগের অংশ হিসেবে ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি।
জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিচারপতি আব্দুস সাত্তার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। এর মধ্যেই ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ তৎকালীন সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সামরিক শাসন জারি করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন। বিএনপিও তখন কঠিন রাজনৈতিক পরিস্থিতির মুখে পড়ে।
দলের নেতাদের অনুরোধে ১৯৮২ সালে বিএনপির সাধারণ সদস্য হিসেবে আনুষ্ঠানিক রাজনীতিতে যুক্ত হন খালেদা জিয়া। এক বছরের মাথায় ১৯৮৩ সালে তিনি দলের ভাইস চেয়ারম্যান হন। এরপর ১৯৮৪ সালের আগস্টে বিএনপির চেয়ারপারসনের দায়িত্ব পান।
দলীয় নেতৃত্ব গ্রহণের পর তার রাজনীতির প্রধান ক্ষেত্র হয়ে ওঠে এরশাদবিরোধী আন্দোলন। ১৯৮৩ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর দলীয় কার্যালয়ের সামনে বড় জনসমাবেশে প্রথমবারের মতো ব্যাপকভাবে জনসমক্ষে আসেন তিনি। একই বছরের ২৮ অক্টোবর বাংলাদেশ সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচিতেও নেতৃত্ব দেন। পুলিশের বাধায় কর্মসূচি পণ্ড হওয়ার পর তাকে কিছু সময়ের জন্য গৃহবন্দী করা হয়।
পরবর্তী সময়ে সাতদলীয় জোটের নেতৃত্বে ধারাবাহিক আন্দোলন চালিয়ে যান খালেদা জিয়া। হরতাল, ঘেরাও, গণপ্রতিরোধ দিবস ও প্রত্যক্ষ সংগ্রামসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সরাসরি অংশ নেন তিনি। আন্দোলনের একপর্যায়ে ১৯৮৫ সালেও তাকে গৃহবন্দী করা হয়।
১৯৮৬ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলোচনা শুরু হয়। প্রথমদিকে বিএনপির সাতদলীয় জোট, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট এবং বামপন্থী পাঁচদলীয় জোট নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত নেয়। পরে আওয়ামী লীগ, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), জামায়াতে ইসলামীসহ কয়েকটি দল নির্বাচনে অংশ নিলেও খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি জোট বর্জনের অবস্থানেই থাকে।
ওই নির্বাচনের আগে মার্চে আবারও গৃহবন্দী হন খালেদা জিয়া। নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে এরশাদ রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। বিএনপির দাবি ছিল, নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি হয়েছে। নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্তের পর খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়ে বলে দলটির নেতারা মনে করেন।
এরশাদবিরোধী দীর্ঘ আন্দোলনে কোনো ধরনের সমঝোতায় না যাওয়ার অবস্থান থেকেই খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে ‘আপসহীন’ শব্দটি জড়িয়ে যায়। সাতদলীয় জোটসহ অন্য বিরোধী জোটগুলোর যুগপৎ আন্দোলন শেষ পর্যন্ত ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। ৬ ডিসেম্বর এরশাদ সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে সেই আন্দোলনের সমাপ্তি ঘটে।
এরশাদের পতনের পর আন্দোলনকারী প্রধান তিন রাজনৈতিক জোটের সমঝোতা ও যৌথ রূপরেখার ভিত্তিতে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। তার অধীনেই ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
সেই নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে আবির্ভূত হলে সরকার গঠন করেন খালেদা জিয়া। এর মধ্য দিয়ে তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন। একই সঙ্গে বিশ্বের দ্বিতীয় মুসলিম নারী সরকারপ্রধান হওয়ার স্বীকৃতিও পান।
তার প্রথম সরকারের সময় বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসে। সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা থেকে দেশ আবার সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় ফিরে যায়।
১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সালের সরকারে অর্থনৈতিক সংস্কারের পাশাপাশি শিক্ষায় বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়। বাজারমুখী অর্থনৈতিক নীতির দিকে অগ্রসর হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষাখাতে বড় বাজেট বরাদ্দ, সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা এবং মেয়েদের বিদ্যালয়ে অংশগ্রহণ বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। নারী শিক্ষার প্রসারেও ওই সময়ের সরকারের ভূমিকার কথা বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে তুলে ধরে আসছে।
১৯৯৬ সালে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ আন্দোলন শুরু করে। রাজনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান সংবিধানে যুক্ত করা হয়। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ষষ্ঠ সংসদ ১৯৯৬ সালের মার্চে ত্রয়োদশ সংশোধনী পাস করে এই ব্যবস্থার সাংবিধানিক ভিত্তি দেয়।
পরবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতার পরিবর্তন হলে বিরোধীদলীয় নেত্রীর দায়িত্ব নেন খালেদা জিয়া। ২০০১ সাল পর্যন্ত তিনি ওই দায়িত্বে ছিলেন।
২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট বিজয়ী হলে দ্বিতীয় দফায় পূর্ণ মেয়াদের সরকার পরিচালনার সুযোগ পান খালেদা জিয়া। ২০০৬ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
সংশোধিত সংবিধানের বিধান অনুযায়ী ২০০৬ সালের ২৯ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন খালেদা জিয়া। কিন্তু পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাঠামোয় পরিবর্তন আসে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই সময়টি ‘১/১১’ নামে পরিচিত। পরবর্তী প্রায় দুই বছর সেনাসমর্থিত অন্তর্বর্তী সরকার দেশ পরিচালনা করে।
ওই সরকারের সময় খালেদা জিয়াকে কারাগারে নেওয়া হয়। তার বড় ছেলে তারেক রহমান পরে লন্ডনে চলে যান। ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো প্রথমে থাইল্যান্ড এবং পরে মালয়েশিয়ায় অবস্থান করেন। ২০১৫ সালে মালয়েশিয়ায় তার মৃত্যু হয়।
সে সময় খালেদা জিয়াকে দেশের বাইরে পাঠানোর চেষ্টা হয়েছিল বলে বিএনপির পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে দাবি করা হয়েছে। তবে তিনি দেশ ছাড়তে রাজি হননি। বাংলাদেশকেই নিজের একমাত্র ঠিকানা হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন তিনি।
পরবর্তী সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের বিরোধিতায় সোচ্চার হন খালেদা জিয়া। সুপ্রিম কোর্ট এ ব্যবস্থাকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করার পর আওয়ামী লীগ সরকার সংসদের মাধ্যমে তা বাতিল করে। খালেদা জিয়া এর বিরোধিতা করে দাবি করেছিলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার না থাকলে দেশে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এক সংবাদ সম্মেলনে আদালতের রায় নিয়েও আপত্তি জানিয়েছিলেন তিনি।
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রায় ১৫ বছরের শাসনামলে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন আরও কঠিন হয়ে ওঠে। সেনানিবাসের বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হওয়া, একাধিক মামলা, সাজা, কারাবন্দিত্ব ও দীর্ঘ সময় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বাইরে থাকার মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হন তিনি। বিএনপি ও বিভিন্ন মহল এসব ঘটনাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়রানি হিসেবে অভিহিত করেছে।
বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এসব পদক্ষেপের লক্ষ্য ছিল তাকে সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে রাখা। তবে শারীরিক অসুস্থতা ও বন্দিত্বের মধ্যেও খালেদা জিয়া নিজের রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সরে যাননি।
২০২৪ সালে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন পরে ব্যাপক গণআন্দোলনে রূপ নেয়। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে এবং শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে যান। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বিএনপিও নতুন করে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে। খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ সন্তান তারেক রহমানের নেতৃত্বে দলটি আবার রাষ্ট্রক্ষমতায় ফেরার পথে এগিয়ে যায়।
দীর্ঘদিন বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভোগার পর ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর মারা যান সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তার জানাজায় বিপুলসংখ্যক মানুষের উপস্থিতি ঘটে। বিএনপির দাবি, এটি মুসলিম বিশ্বের সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বৃহৎ জানাজায় পরিণত হয়েছিল।
চার দশকের রাজনৈতিক জীবনে খালেদা জিয়া যেমন একাধিকবার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছেন, তেমনি দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন বিরোধী দলের আন্দোলন, কারাবাস ও রাজনৈতিক চাপের মধ্যে। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন এবং পরবর্তী রাজনৈতিক সংঘাত—বাংলাদেশের রাজনীতির বহু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার নাম।
জন্মদিনে তাই বিএনপির নেতাকর্মীদের কাছে খালেদা জিয়ার স্মৃতি শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বা দলীয় প্রধানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাদের কাছে তিনি দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, প্রতিকূলতার মুখে অনড় থাকা এবং ‘আপসহীন’ নেতৃত্বের প্রতীক।





