স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দায়িত্বে থাকলে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে না বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।

সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ মন্তব্য করেন।

নাহিদ ইসলাম বলেন, রাজধানীতে রাতের বেলা তিন ঘণ্টা ধরে ভাঙচুর চললেও প্রশাসন তা ঠেকাতে না পারার ঘটনা গ্রহণযোগ্য নয়। তার দাবি, সরকারি ইন্ধন, রাষ্ট্রীয় মদদ এবং দলীয় নেতাকর্মীদের প্রত্যক্ষ সহায়তায় এসব ঘটনা ঘটেছে।

তিনি অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালের ৬ আগস্টের পর থেকে বিএনপির নেতাকর্মীরা সারাদেশে নৈরাজ্য, দখলবাজি, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির যে কার্যক্রম শুরু করেছিলেন, তার ধারাবাহিকতা এখনো চলছে।

সাম্প্রতিক সময়ে মিরপুরের রাড্ডা সেন্টার এবং কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে ভাঙচুরের ঘটনা তুলে ধরে তিনি বলেন, এসব ঘটনায় প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা স্পষ্ট হয়েছে এবং দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি সামনে এসেছে।

নাহিদ ইসলামের ভাষ্য, মিরপুরের রাড্ডা সেন্টারটি রাতের আঁধারে প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে ভাঙচুর করা হয়েছে। সেখানে স্থানীয় বিএনপির সংশ্লিষ্টতা এবং সংরক্ষিত এমপির নাম এসেছে বলে দাবি করেন তিনি।

তিনি বলেন, পুলিশ প্রশাসনের নীরবতা ও পরোক্ষ সহযোগিতা ছাড়া রাজধানীতে এত দীর্ঘ সময় ধরে এভাবে ভাঙচুর চালানো সম্ভব নয় বলে এনসিপি মনে করে।

সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে ভাঙচুরের প্রসঙ্গ টেনে নাহিদ বলেন, সেখানেও প্রশাসন নিষ্ক্রিয় ছিল। তার দাবি, সেখানে ভাঙচুর ও একটি ফৌজদারি অপরাধ সংঘটিত হলেও প্রশাসন তা বাধা দিতে বা বন্ধ করতে পারেনি।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, হামলাকারীদের পরিচয় বা ভুক্তভোগীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে এখন ভুক্তভোগীকেই দায়ী করার চেষ্টা চলছে। এ বিষয়ে সরকার ‘নানা ধরনের নাটক সাজাচ্ছে’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, রাজধানীতে ঘটনাগুলো ঘটায় এবং গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রকাশ হওয়ায় মানুষ জানতে পেরেছে। তবে তার দাবি, সারাদেশের পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক।

হবিগঞ্জে সিএনজি বা অটোরিকশা স্ট্যান্ড দখলকে কেন্দ্র করে মারামারি এবং সাভারে মাদ্রাসা দখলের চেষ্টার ঘটনার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, সারাদেশে এক ধরনের নৈরাজ্য চলছে। দেশে কার্যকর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকার আগে বলেছিল নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হবে। কিন্তু তার দাবি, বিএনপি সরকার নির্বাচিত হয়ে আসার পর পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে।

তিনি অভিযোগ করেন, সরকার দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না এবং প্রশাসনের সহযোগিতায় সারাদেশে দখল-বাণিজ্য চলছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সমালোচনা করে নাহিদ বলেন, তিনি বিভিন্ন সময় অসংলগ্ন বক্তব্য দিয়েছেন এবং দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন। সংস্কার ইস্যুতেও তিনি জাতির সঙ্গে ‘প্রতারণামূলক কথা’ বলেছেন বলে অভিযোগ করেন এনসিপির আহ্বায়ক।

নাহিদের ভাষ্য, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে প্রশ্ন করা হলে বা জবাবদিহির আওতায় আনার চেষ্টা হলে তিনি ‘এটা পল্টনের বক্তব্য’, ‘এটা রাজপথের বক্তব্য’—এ ধরনের কথা বলে মূল বিষয় এড়িয়ে যেতেন।

বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যে স্বাভাবিক নেই, তা এখন জনগণের সামনে স্পষ্ট। এজন্য বর্তমান সরকার, প্রধানমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে দায়ী করে তিনি বলেন, বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে দায়িত্বে রেখে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা সম্ভব নয়।

সারাদেশে এনসিপির নেতাকর্মীদের উদ্দেশে নাহিদ ইসলাম বলেন, তারা যেন ‘মজলুম জনগণের’ পাশে দাঁড়ান এবং যেখানে দখলদারি, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটছে, সেখানে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।

সরকারি চাকরিতে দলীয়করণের অভিযোগ

সংবাদ সম্মেলনে সরকারি চাকরিতে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দলীয়করণের অভিযোগও তোলেন নাহিদ ইসলাম।

তিনি বলেন, বিগত স্বৈরাচারের আমলে সরকারি চাকরির পরীক্ষায় ভেরিফিকেশন ও ভাইবার নামে রাজনৈতিক মতাদর্শ বিবেচনায় নিয়ে অনেক প্রার্থীকে বাদ দেওয়ার অভিযোগ ছিল। রাজনৈতিক ভিন্নমতের কারণেও অনেকে নিয়োগ প্রক্রিয়া থেকে বাদ পড়েছিলেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

নাহিদ ইসলামের অভিযোগ, বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরও একই ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ভাইবার নম্বর ৪০০ শতাংশ বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

তার দাবি, বিভিন্ন সংসদ সদস্য প্রকাশ্যে এমন বক্তব্য দিয়েছেন যে লিখিত পরীক্ষায় পাস করলেই হবে এবং ভাইবার সময় তাদের কাছে প্রবেশপত্র নিয়ে গেলে চাকরি হয়ে যাবে।

একজন প্রতিমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্যের প্রসঙ্গও তোলেন নাহিদ। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, সব চাকরি দলের লোকেরা পাবে।

প্রাথমিকের নিয়োগ পরীক্ষাকে এ ধরনের প্রবণতার সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ উল্লেখ করে নাহিদ দাবি করেন, সেখানে প্রায় আড়াই হাজার চাকরিপ্রার্থীকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

তার দাবি, বাদ পড়াদের বেশির ভাগের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা, সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা বা রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের সুস্পষ্ট তথ্য-প্রমাণ নেই।

বাদ পড়াদের মধ্যে আন্দোলনের অনেক সহযোদ্ধা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সহপাঠীও রয়েছেন বলে জানান তিনি।

নাহিদ বলেন, গতকাল শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, বাদ পড়াদের পর্যায়ক্রমে আবার নেওয়া হবে বা সুযোগ দেওয়া হবে। আন্দোলন ও প্রতিবাদের মুখে শিক্ষামন্ত্রী এমন বক্তব্য দিয়েছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, সুস্পষ্ট তথ্য-প্রমাণ ছাড়া কাউকে চাকরির প্রক্রিয়া থেকে বাদ দেওয়া উচিত নয়। কোনো চাকরিপ্রার্থী পরীক্ষায় যোগ্য হলে এবং তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী বা রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগের তথ্য-প্রমাণ না থাকলে ভেরিফিকেশনের নামে তাকে হয়রানি বা বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই।

তিনি বলেন, সব চাকরিপ্রার্থীর পাশে এনসিপি থাকবে। কোনো একজন চাকরিপ্রার্থীও অন্যায়ভাবে নিয়োগ প্রক্রিয়া থেকে বাদ পড়লে তার জন্য দল কথা বলবে এবং প্রয়োজনে আন্দোলনে থাকবে।

নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, কেউ যদি মনে করেন তাকে অন্যায়ভাবে চাকরির প্রক্রিয়া থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে এবং এ বিষয়ে তার কাছে তথ্য-প্রমাণ থাকে, তাহলে তিনি এনসিপির কার্যালয়ে যোগাযোগ করতে পারেন। দল তাদের পাশে থাকবে বলে জানান তিনি।