যশোরের শার্শা উপজেলায় চলতি বছরের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফলে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা গেছে। উপজেলার কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই শতভাগ পাসের সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। এর মধ্যে তিনটি প্রতিষ্ঠানে অংশ নেওয়া সব পরীক্ষার্থীই অকৃতকার্য হয়েছে। এ ফল নিয়ে অভিভাবক ও স্থানীয় সচেতন মহলে হতাশা তৈরি হয়েছে।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, সবচেয়ে খারাপ ফল হয়েছে মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে। উপজেলার ৩৩টি মাদরাসার মধ্যে বারোপোতা সিদ্দিকীয়া দাখিল মাদরাসা ও ঘিবা দারুল উলুম দাখিল মাদরাসা থেকে কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি।
দাখিলে নিবন্ধিত ৮৩৭ শিক্ষার্থীর মধ্যে পরীক্ষায় অংশ নেয় ৮১২ জন। উত্তীর্ণ হয়েছে ৩৪২ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছে মাত্র তিনজন। পাসের হার ৪০ দশমিক ৮৬ শতাংশ।
সাধারণ স্কুল পর্যায়েও ফল আশানুরূপ নয়। ৩৫টি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সাড়াতলা মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া চার শিক্ষার্থীর সবাই ফেল করেছে। আরেকটি বিদ্যালয় থেকে এবার কোনো শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়নি।
সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে উপজেলায় নিবন্ধিত দুই হাজার ৩০০ শিক্ষার্থীর মধ্যে পরীক্ষায় অংশ নেয় দুই হাজার ২৬১ জন। এর মধ্যে এক হাজার ৫০২ জন পাস করেছে। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১২৬ জন। পাসের হার ৬৫ দশমিক ৩ শতাংশ।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) শার্শা উপজেলা অতিরিক্ত মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার এস.এম. সুলতান মাহমুদ ফলাফলের তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
উপজেলায় সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে তুলনামূলক ভালো ফল করেছে নাভারন বুরুজ বাগান মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠানটির ১২২ পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১১০ জন পাস করেছে। পাসের হার ৯০ দশমিক ১৬ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৫ জন।
ভালো ফল করা অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বেনাপোল মরিয়ম মেমোরিয়াল বালিকা বিদ্যালয়ে পাসের হার ৮০ দশমিক ৮৫ শতাংশ, জিপিএ-৫ পেয়েছে ২০ জন। শার্শা সরকারি পাইলট মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পাসের হার ৭৬ দশমিক ৮২ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে আটজন।
বাগআঁচড়া ইউনাইটেড মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পাসের হার ৭৪ দশমিক ৪১ শতাংশ, জিপিএ-৫ পেয়েছে ১১ জন। বাগআঁচড়া সম্মিলিত গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজে পাসের হার ৭২ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে নয়জন।
শতভাগ ফেল করা তিন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সংখ্যার অনুপাত নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সাড়াতলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে চার পরীক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক রয়েছেন নয়জন। তারপরও কেউ পাস করতে পারেনি। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা শিক্ষক সংকটকে ফল বিপর্যয়ের একটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
বারোপোতা সিদ্দিকীয়া দাখিল মাদরাসায় ১২ জন শিক্ষকের অধীনে ১৭ পরীক্ষার্থী অংশ নিয়ে সবাই ফেল করেছে। ঘিবা দারুল উলুম দাখিল মাদরাসায় নয়জন শিক্ষকের পাঠদানের পরও ২৩ পরীক্ষার্থীর কেউ উত্তীর্ণ হতে পারেনি।
ফল বিপর্যয়ের জন্য শিক্ষকদের দায়িত্বহীনতা, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা এবং ব্যবসায় মনোযোগ দেওয়াকে দায়ী করেছেন স্থানীয় কিছু অভিভাবক ও সচেতন ব্যক্তি। তাদের অভিযোগ, অনেক শিক্ষক নিয়মিত সময়ে প্রতিষ্ঠানে উপস্থিত হন না। পাশাপাশি পরিচালনা কমিটিতে রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসক নিয়োগ এবং জবাবদিহির ঘাটতির কারণে শিক্ষার মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
তবে শিক্ষকদের দাবি, অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসে না এবং অভিভাবকরাও সন্তানদের পড়াশোনার বিষয়ে যথেষ্ট খোঁজ রাখেন না। প্রতিষ্ঠান থেকে বারবার জানানো হলেও অনেক অভিভাবক কার্যকর ভূমিকা নেন না বলেও দাবি তাদের।
শিক্ষার্থীদের নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে ফেরানো এবং পড়াশোনায় মনোযোগী করতে প্রতিষ্ঠানগুলো কী ধরনের উদ্যোগ নিয়েছিল, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
শার্শা উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার এ.কে.এম. নুরুজ্জামান জানান, সম্প্রতি এমপিওভুক্ত হওয়া বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আগের বছরের তুলনায় এবার অনেক খারাপ ফল করেছে।
তিনি বলেন, ‘শতভাগ ফেল করা প্রতিষ্ঠানগুলোর এই ফলাফল অত্যন্ত দুঃখজনক ও হতাশাজনক। আমরা বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। কী কারণে এমন বিপর্যয় ঘটল, তা খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষকদের অবশ্যই আরও বেশি দায়িত্বশীল হতে হবে।’





