গঠনমূলক সমালোচনা ও যৌক্তিক পরামর্শ সরকার ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করছে বলে জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেছেন, সমালোচনা ও পরামর্শের মাধ্যমে সংস্কারের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করে সঠিক পথে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘Beyond the Ballot: Between Promise and Performance—নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশ: রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতা’ শীর্ষক আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
আইনমন্ত্রী বলেন, সরকারের সমালোচনা করার অধিকার নাগরিকদের রয়েছে এবং সেই অধিকার নিশ্চিত করা সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের কর্মসূচি পালন করবে এবং সরকারের সমালোচনা করবে—এটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্বাভাবিক অংশ।
তিনি বলেন, দেশে এমন একটি সংস্কৃতি গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেখানে মানুষ নির্ভয়ে মত প্রকাশ করতে পারে। মতপ্রকাশের কারণে লেখক, সাংবাদিক, কার্টুনিস্ট কিংবা বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে হয়রানি বা গ্রেপ্তারের অতীত সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে সরকার।
আইন ও নীতিমালার কোনো বিষয়কে সরকার চূড়ান্ত বা অপরিবর্তনীয় মনে করে না উল্লেখ করে মো. আসাদুজ্জামান বলেন, কোনো আইন প্রয়োগের পর সংশোধনের প্রয়োজন দেখা দিলে সরকার তা পরিবর্তনের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। মানুষের প্রয়োজনেই আইন প্রণয়ন করা হয় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তা সংশোধনও করা যেতে পারে।
মানবাধিকার কমিশন আইন এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এসব আইন প্রণয়নের আগে ব্যাপক আলোচনা ও যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। গুমের ঘটনাকে সাধারণ অপরাধ এবং ব্যাপক ও পদ্ধতিগত অপরাধ হিসেবে পৃথকভাবে বিবেচনা করে বিচারিক এখতিয়ার নির্ধারণের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।
কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়ার সুযোগ থাকা প্রয়োজন বলেও মত দেন আইনমন্ত্রী। দায়িত্বশীল কর্মকর্তা প্রকৃত তথ্য গোপন বা ভুল তথ্য দিলে তাকে জবাবদিহির আওতায় আনার ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
সংবিধান সংস্কার প্রসঙ্গে মো. আসাদুজ্জামান বলেন, জুলাই সনদ সামনে রেখে সরকার এ বিষয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। সংবিধানের মৌলিক কাঠামো অক্ষুণ্ন রেখেই প্রয়োজনীয় সংশোধন করতে হবে। বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে সংস্কার এগিয়ে নেওয়ার বিষয়টি জুলাই সনদের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি বলেন, সংবিধান সংস্কার কমিটিতে বিরোধী দলসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। যৌক্তিক প্রস্তাব ও মতামত বিবেচনার মাধ্যমে সংস্কার প্রক্রিয়াকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার সুযোগ রয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক দলগুলোকে গঠনমূলকভাবে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও কার্যকর ভারসাম্য নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী বলেন, বিচার বিভাগের প্রশাসনিক কাঠামো এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রস্তাব বাস্তব অভিজ্ঞতা ও সাংবিধানিক বিধান বিবেচনায় যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, দক্ষতা ও কার্যকর প্রশাসনিক কাঠামো নিশ্চিত করা।
বিচারিক কোনো আদেশ নিয়ে আপত্তি থাকলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী আপিল বা রিভিশনের সুযোগ রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিচারিক কার্যক্রমের স্বাভাবিক ও আইনানুগ প্রক্রিয়া সমুন্নত রাখার ওপর সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে।
দুর্নীতি দমন কমিশন প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী জানান, দায়িত্ব নেওয়ার পর দ্রুত নতুন কমিশন গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সরকারের দায়িত্ব পালনে ভুল-ত্রুটি হতে পারে স্বীকার করে তিনি বলেন, লক্ষ্য হলো সংস্কারের মাধ্যমে একটি কার্যকর, স্বচ্ছ ও জনবান্ধব রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা। সে কারণে সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে গঠনমূলক সমালোচনা ও যৌক্তিক পরামর্শকে স্বাগত জানানো হবে।
আইনমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা সামনে এগিয়ে যেতে চাই, পিছনে ফিরতে চাই না।’ সংস্কার প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম, আইনজীবীসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত নিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য ও কার্যকর কাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
সিজিএসের সভাপতি জিল্লুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন, গণফোরাম সভাপতি সুব্রত চৌধুরী, জাতীয় পার্টির (জাপা) মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সোহরাব হাসানসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, মানবাধিকার সংগঠন, গণমাধ্যম ও আইন পেশার প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন।
আলোচনায় নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন, জনগণের প্রত্যাশা, রাজনৈতিক জবাবদিহি, সুশাসন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর করা এবং রাষ্ট্র সংস্কারের বিভিন্ন দিক নিয়ে মতবিনিময় হয়।





