ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও তেহরানের সম্পর্ক আবারও দ্বিমুখী পথে এগোচ্ছে। একদিকে বাড়ছে পারমাণবিক চাপ ও সামরিক হুমকি, অন্যদিকে কূটনৈতিক যোগাযোগও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। এই পরিস্থিতিতে বড় প্রশ্ন হলো—যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর যে সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করেছে, সেটিকে কীভাবে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ফলাফলে রূপ দেওয়া যায়।
‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতি অনির্দিষ্টকাল ধরে চালিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে সেই চাপকে একটি যাচাইযোগ্য ও টেকসই পারমাণবিক চুক্তিতে রূপ দেওয়াই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কার্যকর পথ হতে পারে।
৯ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) বোর্ড অব গভর্নরস ইরানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক বিস্তার রোধসংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘনের অভিযোগ জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে পাঠিয়েছে। দুই দশকের মধ্যে এটি এ ধরনের প্রথম পদক্ষেপ।
এর এক দিন পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নাতাঞ্জের কাছে পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন এলাকায় ইরানের নতুন তৎপরতা নিয়ে সতর্ক করেন। তবে একই সময়ে কূটনৈতিক উদ্যোগও অব্যাহত রয়েছে।
হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নিয়ে ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে আলোচনার প্রস্তুতি চলছে। পাশাপাশি ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ ব্রিকসের কয়েকটি দেশ আঞ্চলিক সংঘাতের রাজনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে ইরানের ওপর উল্লেখযোগ্য সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করেছে। তবে চাপ প্রয়োগই কোনো নীতির চূড়ান্ত লক্ষ্য হতে পারে না। সেই চাপকে কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক ফলাফলে রূপান্তর করাই মূল বিষয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সামনে এখন দুটি সম্ভাব্য পথ রয়েছে। প্রথমত, দীর্ঘ সময় ধরে সামরিক হামলা, নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখা। দ্বিতীয়ত, এসব উপকরণকে কাজে লাগিয়ে এমন একটি যাচাইযোগ্য চুক্তিতে পৌঁছানো, যা ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের পথ বন্ধ করবে এবং দীর্ঘমেয়াদে আঞ্চলিক সংঘাতের ঝুঁকি কমাবে।
ট্রাম্প প্রশাসনের ঘোষিত লক্ষ্য হলো ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সব পথ থেকে দূরে রাখা। তবে এই লক্ষ্য দীর্ঘমেয়াদে কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, সেটিই সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন।
সামরিক হামলার মাধ্যমে পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস করা বা একটি কর্মসূচিকে কিছু সময়ের জন্য পিছিয়ে দেওয়া সম্ভব। কিন্তু এতে কোনো দেশের প্রযুক্তিগত জ্ঞান মুছে যায় না। একইভাবে পারমাণবিক কর্মসূচির পেছনে থাকা রাজনৈতিক কারণও দূর হয় না এবং ভবিষ্যৎ কোনো ইরানি সরকার কী সিদ্ধান্ত নেবে, সেটিও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।
এই বাস্তবতায় একটি নতুন, বাস্তবসম্মত, যাচাইযোগ্য ও দীর্ঘস্থায়ী চুক্তির প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে। শুধু নিষেধাজ্ঞা আরোপ বা সামরিক সক্ষমতা ধ্বংসের পরিবর্তে এমন একটি কাঠামো দরকার, যার মাধ্যমে ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম আন্তর্জাতিকভাবে পর্যবেক্ষণ ও যাচাই করা সম্ভব হবে।
‘সর্বোচ্চ চাপ’ নিজে কোনো কৌশলগত সাফল্য নয়। চাপ তখনই কার্যকর, যখন তা আলোচনার টেবিলে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জনের সুযোগ তৈরি করে। সামরিক শক্তি ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা যদি শুধু সংঘাত দীর্ঘায়িত করে, তাহলে সেগুলোই শেষ পর্যন্ত নীতির উদ্দেশ্যে পরিণত হয়।
এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের উচিত তার অর্জিত কৌশলগত প্রভাবকে আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক সমঝোতায় রূপ দেওয়া।
এই প্রক্রিয়ায় হরমুজ প্রণালিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ওমান ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর অংশগ্রহণে হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতও বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের রাজনৈতিক সমাধান ও সংযমের আহ্বান জানিয়েছে।
পারমাণবিক সংকট ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকটকে পুরোপুরি আলাদা করে দেখা কঠিন। ফলে পারমাণবিক চুক্তির পাশাপাশি বৃহত্তর আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভবিষ্যৎ সরকারের অনিশ্চয়তা। সামরিক অভিযান কোনো স্থাপনা ধ্বংস করতে পারে, কিন্তু ভবিষ্যতের কোনো ইরানি সরকার আবার একই ধরনের কর্মসূচি নেবে না—এমন নিশ্চয়তা দিতে পারে না।
বিপরীতে, আন্তর্জাতিকভাবে যাচাইযোগ্য একটি চুক্তি নিয়ম, পর্যবেক্ষণ ও পারস্পরিক দায়বদ্ধতার কাঠামো তৈরি করতে পারে। সে হিসেবে সামরিক অভিযানের সাময়িক ফলাফলের তুলনায় কূটনৈতিক সমঝোতা দীর্ঘমেয়াদে বেশি কার্যকর হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামনে এখন প্রশ্ন শুধু শক্তি প্রয়োগ করা হবে কি না—তা নয়। বরং ইতোমধ্যে প্রয়োগ করা সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপকে কীভাবে স্থায়ী রাজনৈতিক ফলাফলে রূপ দেওয়া যায়, সেটিই মূল চ্যালেঞ্জ।
ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখাই যদি চূড়ান্ত লক্ষ্য হয়, তাহলে সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপকে একটি যাচাইযোগ্য, বাস্তবসম্মত ও দীর্ঘস্থায়ী পারমাণবিক চুক্তির দিকে পরিচালিত করাই হতে পারে অধিক কার্যকর কৌশল।





