সাংবাদিকদের স্বার্থে ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়নে সরকার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবে বলে জানিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী। প্রয়োজনে বিষয়টি মন্ত্রিসভায় উত্থাপন করা হবে বলেও জানান তিনি।
রোববার (৪ অক্টোবর) তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) নেতৃবৃন্দের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ওয়েজবোর্ড নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এক ধরনের অচলাবস্থা চলছে। নবম ওয়েজবোর্ড যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হয়নি। দশম ওয়েজবোর্ড ঘোষণার দাবির পাশাপাশি নবম ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়নের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এ নিয়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় শ্রম মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করছে এবং এ উদ্যোগ আরও জোরদার করা হবে।
সাংবাদিকদের সুরক্ষা ও কল্যাণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে ইয়াসের খান চৌধুরী বলেন, জনগণের কাছে সঠিক তথ্য তুলে ধরতে সাংবাদিকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাদের যথাযথ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা না গেলে ভালো সাংবাদিকরা পেশায় আগ্রহ হারাতে পারেন এবং নতুন ভালো সাংবাদিক তৈরি হওয়ার পথও বাধাগ্রস্ত হবে।
তিনি বলেন, গণমাধ্যম মালিকদেরও সাংবাদিকদের অধিকার ও কল্যাণের বিষয়ে আন্তরিক হতে হবে। সরকার কোনো সিদ্ধান্ত বা ঘোষণা দিলেও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো তা বাস্তবায়ন না করলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া সম্ভব নয়।
সাংবাদিকের সংজ্ঞা নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে পেশাদার সাংবাদিকতা করা ব্যক্তিদের পাশাপাশি বিভিন্ন অনলাইন পোর্টাল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের সাংবাদিক পরিচয় দেওয়া ভুয়া সাংবাদিকদের কারণে প্রকৃত সাংবাদিকরা হুমকির মুখে পড়ছেন। এতে জনগণ ও গণতন্ত্রও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কারা সাংবাদিক হিসেবে বিবেচিত হবেন, সে বিষয়ে সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে সমন্বিতভাবে প্রস্তাব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সাইবার নিরাপত্তা আইন প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ বা সাংবাদিকদের লেখালেখি বন্ধ করা এ আইনের উদ্দেশ্য নয়। জনগণকে নিরাপদ রাখাই এর মূল লক্ষ্য। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে হয়রানি, অসত্য তথ্য ও অপতথ্য ছড়িয়ে ক্ষতি করার ঘটনা মোকাবিলায় সাইবার নিরাপত্তা প্রয়োজন।
কোনো সংবাদমাধ্যম বা সাংবাদিকের প্রকাশিত সংবাদ ভুলবশত আইনের ব্যত্যয় ঘটালে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার আগে আদালতের অনুমতি নেওয়ার যে প্রস্তাব সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে এসেছে, সরকার তা বিবেচনা করছে বলেও জানান তিনি। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় শব্দচয়ন ও বিধান কীভাবে অন্তর্ভুক্ত করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা চলছে।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও বাকস্বাধীনতায় সরকারের আস্থার কথা জানিয়ে ইয়াসের খান চৌধুরী বলেন, গণমাধ্যম কীভাবে চলবে, সে বিষয়ে সরকার হস্তক্ষেপ করবে না। সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে।
সাংবাদিকদের দাবিগুলো লিখিতভাবে দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, লিখিত প্রস্তাব পাওয়া গেলে সেগুলো বাস্তবায়ন ও পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণে সরকারের সুবিধা হবে। সাংবাদিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে এ ধরনের মতবিনিময় অব্যাহত রাখার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
সভায় ডিইউজে সভাপতি মো. শহীদুল ইসলাম বলেন, সাংবাদিকরা দিনরাত পরিশ্রম করে জনগণের সামনে দেশের খবর তুলে ধরেন। অনেক সময় জীবনের ঝুঁকি নিয়েও দায়িত্ব পালন করেন তারা। অথচ ন্যায্য পারিশ্রমিক থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়নে সরকারের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, ভুয়া সাংবাদিক ও তাদের বিভিন্ন সংগঠনের দৌরাত্ম্য বেড়েছে। নামে-বেনামে বিভিন্ন সংগঠনের মাধ্যমে সাংবাদিকতার ভুয়া পরিচয়পত্র ব্যবহার করে নানা অপরাধ করা হচ্ছে। ভুয়া সাংবাদিকদের নিয়ন্ত্রণে ডিইউজেসহ মূলধারার সাংবাদিক সংগঠনগুলো সরকারকে সহযোগিতা করতে চায়।
ডিইউজে সাধারণ সম্পাদক খুরশীদ আলম বলেন, কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দেওয়া উচিত নয়। ফেসবুক পেজ খুলে নিজেদের সাংবাদিক পরিচয় দেওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সাংবাদিকদের কল্যাণে সরকারের সমন্বিত উদ্যোগের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, দুয়েকটি গণমাধ্যম ছাড়া অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান নবম ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়ন করেনি। পেশাগত মর্যাদা ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়ন জরুরি।
ডিইউজে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. দিদারুল আলম দিদার বলেন, আইন অনুযায়ী সংবাদকর্মীদের দুটি গ্র্যাচুইটি পাওয়ার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। অষ্টম ওয়েজবোর্ড পর্যন্ত গণমাধ্যমে দুটি গ্র্যাচুইটি পাওয়ার বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত ছিল। সাংবাদিকতা ঝুঁকিপূর্ণ পেশা হওয়ায় সংবাদকর্মীদের আয়ের বিপরীতে প্রদেয় ট্যাক্সকে ফ্রিঞ্জ বেনিফিট হিসেবে বিবেচনার বিষয়ে আপিল বিভাগের একটি রায় রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তার ভাষ্য, বিষয়টি যথাযথভাবে জানা না থাকায় ২০১৯ সালে গ্র্যাচুইটি ও ট্যাক্স নিয়ে একটি বিতর্কিত সুপারিশ যুক্ত হওয়ায় অনেক গণমাধ্যমে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।
বাসস এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের পক্ষে এ বিষয়ে হাইকোর্টে রিট করার কথা উল্লেখ করে দিদার বলেন, হাইকোর্ট মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তকে অগ্রহণযোগ্য এবং তৎকালীন কয়েকজন মন্ত্রীর সুপারিশে কমিটির সিদ্ধান্তকে অবৈধ বা বাতিল ঘোষণা করে রায় দিয়েছেন। বিষয়টি বর্তমানে আপিল বিভাগে রয়েছে উল্লেখ করে সরকারের করা আপিল প্রত্যাহারের দাবি জানান তিনি। আপিল প্রত্যাহার করা হলে সংবাদকর্মীদের দীর্ঘদিনের গ্র্যাচুইটি ও ট্যাক্স সংক্রান্ত জটিলতার অবসান হবে বলেও জানান তিনি।
এদিকে প্রতি পাঁচ বছর পর ওয়েজবোর্ড ঘোষণার কথা থাকলেও প্রায় নয় বছর ধরে নতুন ওয়েজবোর্ড ঘোষণা না হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে অবিলম্বে দশম ওয়েজবোর্ড ঘোষণার দাবি জানান দিদার।
সভায় ডিইউজের সহ-সভাপতি রাশেদুল হক, দপ্তর সম্পাদক ইকবাল মজুমদার তৌহিদ, কল্যাণ সম্পাদক সালাহউদ্দিন রাজ্জাক, প্রচার সম্পাদক আবুল কালাম, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক রফিক লিটন, নির্বাহী সদস্য মোহাম্মদ গাজী আনোয়ার, তালুকদার এ এইচ এম নুরুল মোমেনসহ অনেকে বক্তব্য দেন।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন সিনিয়র সহ-সভাপতি রফিক মোহাম্মদ, নির্বাহী সদস্য এম. মোশররফ হোসাইন, আবদুল্লাহ মজুমদার, ফখরুল ইসলামসহ অন্যরা।
সভায় সাংবাদিকদের পেশাগত মর্যাদা, কল্যাণ, ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়ন, সাংবাদিকের সংজ্ঞা নির্ধারণ, সাইবার নিরাপত্তা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়।
সাংবাদিকদের স্বার্থে ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেবে সরকার: তথ্য প্রতিমন্ত্রী
বাংলাদেশ২৪৭ নিউজ ডেস্ক
৪ অক্টোবর, ২০২৬
২ সপ্তাহ আগে
শেয়ার করুন:

জাতীয়
বিষয়:সাংবাদিক
মতামত(0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে অ্যাকাউন্ট প্রয়োজন
সংবাদে মতামত প্রকাশ করতে অনুগ্রহ করে নিবন্ধন (Registration) অথবা লগইন করুন।




