সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদে বিরোধী দলকে কতটা অংশ দেওয়া হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দল প্রতিনিধি না দেওয়ায় জুলাই সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী কমিটি গঠন নিয়ে নতুন করে টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে।

সরকারি দল অতীতের রীতি অনুসরণ করে সংসদীয় কমিটি গঠন করতে চায় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

জাতীয় সংসদে বর্তমানে বিষয়ভিত্তিক ১১টি এবং মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত ৩৯টি স্থায়ী কমিটি রয়েছে। জুলাই সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী, মোট ৫০টি কমিটির মধ্যে ১৪টির সভাপতি পদ বিরোধী দল পাওয়ার কথা।

তবে বিরোধী দল এবার অন্তত ১১টি কমিটির সভাপতি পদ পাওয়ার প্রত্যাশা করেছিল। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে এখন পর্যন্ত ১৫টি স্থায়ী কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু সরকারি হিসাব সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি পদ বিরোধী দলকে দেওয়া হয়েছে।

আগামী অধিবেশনে বাকি ৩৫টি কমিটি গঠন হওয়ার কথা থাকলেও এসব কমিটির আর কোনো সভাপতির পদ বিরোধী দল পাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

বিরোধী দলের একটি সূত্র জানায়, স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদ বণ্টন নিয়ে সরকারি দলের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা হয়েছিল। তাদের আশা ছিল, আসন সংখ্যার অনুপাতে মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত অন্তত ১০টি কমিটির সভাপতি পদ তারা পাবে।

সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো সরকারের জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত কমিটিগুলো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পর্যালোচনা, অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশ করতে পারে।

বর্তমান সংবিধান বা সংসদের কার্যপ্রণালি বিধিতে বিরোধী দলকে স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই। তবে জুলাই সনদের প্রস্তাবে সরকারি হিসাব, বিশেষ অধিকার, অনুমিত হিসাব ও সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির সভাপতি পদে বিরোধী দলের সদস্যদের দায়িত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

এ ছাড়া মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদ সংসদের আসন সংখ্যার অনুপাতে বিরোধী দলের মধ্য থেকে নির্বাচনের প্রস্তাব রয়েছে। বিএনপিসহ ৩০টি দল ও জোট এই প্রস্তাবে একমত হয়েছিল।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জুলাই সনদের এই প্রস্তাব বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধন বাধ্যতামূলক নয়। সরকার চাইলে বর্তমান ব্যবস্থাতেই এটি কার্যকর করতে পারে।

সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী, সংসদে গৃহীত প্রস্তাবের মাধ্যমে কমিটির সদস্য নিয়োগ করা হয়। সাধারণত সংসদ নেতার পক্ষে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ কমিটি গঠনের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। সরকারি দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে কমিটি গঠনে তাদের সিদ্ধান্তই কার্যকর হয়।

সংসদ সচিবালয় সূত্র জানায়, কমিটি গঠনের আগে সাধারণত বিরোধী দলের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা করা হয়। কোন কমিটিতে কারা সদস্য থাকবেন, সে বিষয়ে বিরোধী দলের মতামত নেওয়া হয়।

চলতি সংসদে এখন পর্যন্ত ছয়টি বিষয়ভিত্তিক ও নয়টি মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি গঠন হয়েছে। ২৭ আগস্ট থেকে শুরু হতে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে বাকি কমিটিগুলো গঠন হওয়ার কথা।

বিরোধী দলের সংসদীয় দলের মুখপাত্র নাজিবুর রহমান মোমেন বলেন, সরকারি দল সংসদীয় কমিটির সদস্য দেওয়ার জন্য নাম চেয়েছিল। তখন বিরোধী দলের পক্ষ থেকে জুলাই সনদ অনুযায়ী সভাপতি পদ বণ্টনের বিষয়টি তোলা হয়।

তিনি অভিযোগ করেন, সরকারি দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে—বিরোধী দল সংবিধান সংশোধন কমিটিতে প্রতিনিধি না দিলে সংসদীয় কমিটিতে সভাপতি পদ দেওয়া হবে না।

অন্যদিকে সরকারি দলের একটি সূত্র জানায়, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই সংবিধান সংশোধন কমিটি কাজ করছে। বিরোধী দল সেখানে অংশ না নেওয়ায় কমিটি গঠনের বিষয়ে তাদের অবস্থান পরিবর্তন হয়নি।

জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম বলেন, অতীতের রীতি অনুযায়ী এবার সংসদীয় কমিটি গঠন করা হবে। তিনি জানান, সরকারি হিসাব কমিটির সভাপতি পদ এবারও বিরোধী দলকে দেওয়া হয়েছে।

সাবেক জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, সরকারের জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার স্বার্থে সংসদীয় কমিটিগুলো দ্রুত গঠন করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, জুলাই সনদ অনুযায়ী চারটি গুরুত্বপূর্ণ কমিটির সভাপতি পদ বিরোধী দল থেকে হওয়া উচিত এবং মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত কমিটির একটি অংশও আসন অনুপাতে বিরোধী দলের পাওয়া উচিত।