ছবি তোলা ও টিকটক ভিডিও তৈরির সূত্রে পরিচয়ের পর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। সেই পরিচিতির সুযোগ নিয়ে ১৩ বছর বয়সী স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ের নির্জন এলাকায় নিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে।

এ ঘটনায় গ্রেফতার তিন আসামির আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে হত্যার পরিকল্পনা, অপ্রতিমকে পাহাড়ে নিয়ে যাওয়া, তার আইফোন নেওয়া এবং পরবর্তী হামলার ধারাবাহিক বিবরণ উঠে এসেছে। মূল ঘটনাপ্রবাহের বেশ কিছু বিষয়ে তিনজনের বক্তব্যে মিল থাকলেও হত্যার পর কে কোথায় গিয়েছিল এবং কার কী ভূমিকা ছিল—এ নিয়ে তাদের বর্ণনায় কিছু পার্থক্য রয়েছে।

জবানবন্দি অনুযায়ী, ঘটনার প্রায় এক সপ্তাহ আগেই অপ্রতিমকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। পরে ছবি তোলার কথা বলে তাকে কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ের নির্জন এলাকায় নেওয়া হয়। সেখানে প্রথমে তার আইফোন নেওয়া হয়। ফোনটি ফেরত চাওয়াকে কেন্দ্র করে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে কোদালের হাতল দিয়ে তার মাথায় আঘাত করা হয়। পরে তাকে হত্যা করা হয় বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

অপ্রতিম কুমিল্লা বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। গত ১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে বাসা থেকে বের হওয়ার পর সে নিখোঁজ হয়। পরদিন ১৯ সেপ্টেম্বর বেলা ১১টার দিকে কুমিল্লা সদর দক্ষিণের সানন্দা এলাকার লালমাই পাহাড়ের নির্জন জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

এ ঘটনায় গ্রেফতার সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিন (১৯) এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক দুই কিশোর ২০ সেপ্টেম্বর রাতে কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।

আগেই হত্যার পরিকল্পনা

তিন আসামির জবানবন্দির মধ্যে হত্যার পরিকল্পনা নিয়ে সবচেয়ে বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন তুহিন।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় পাঁচ-ছয় মাস ধরে অপ্রতিমের সঙ্গে তার পরিচয় ছিল। এক বন্ধুর মোটরসাইকেলে করে ছবি তোলা ও টিকটক ভিডিও বানানোর জন্য অপ্রতিম তাদের সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় যেত।

তুহিন জবানবন্দিতে জানিয়েছেন, অপ্রতিমের আইফোনের প্রতি তার এবং অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত এক কিশোরের লোভ হয়। ঘটনার আগের শুক্রবার সন্ধ্যায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে তাদের দেখা হয়। সেখানেই অপ্রতিমের আইফোন নেওয়া এবং তাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় বলে তার জবানবন্দিতে উল্লেখ রয়েছে।

অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত কিশোরের জবানবন্দিতেও আগের শুক্রবারের ওই বৈঠকের কথা এসেছে। তবে হত্যার পরিকল্পনার মূল দায় সে তুহিনের ওপর দিয়েছে।

অন্য কিশোরের বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন তাকে জানানো হয় যে তুহিনের সঙ্গে মিলে আইফোনের জন্য অপ্রতিমকে হত্যা করা হবে।

তিন জবানবন্দির বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনাস্থলে তাৎক্ষণিকভাবে হত্যার সিদ্ধান্ত হয়নি; বরং আগে থেকেই অপ্রতিমকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলে উঠে এসেছে।

টিকটকে যোগাযোগ, ছবি তোলার কথা বলে দেখা

তুহিনের জবানবন্দি অনুযায়ী, হত্যার আগের দিন ১৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় ময়নামতির একটি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সামনে অপ্রতিমের সঙ্গে তার দেখা হয়। ওই সময় অপ্রতিম তাকে নিজের টিকটক অ্যাকাউন্টের ঠিকানা দেয়।

ওই রাতেই টিকটকে অপ্রতিমকে মেসেজ করেন তুহিন। পরে অপ্রতিম একটি মোবাইল ফোন নম্বর দিলে সেখানে তাদের কথা হয়। এরপর পরদিন জুমার নামাজের পর দেখা করার সিদ্ধান্ত হয়।

তুহিনের ভাষ্য, অপ্রতিম তার বাবার দোকানে কর্মরত ওই কিশোরকেও একই সময়ে আসতে বলেছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল ছবি তোলা।

তিন আসামির জবানবন্দি থেকে জানা যায়, ছবি তোলার সূত্রে গড়ে ওঠা পরিচিত সম্পর্কের সুযোগেই অপ্রতিমকে নির্জন পাহাড়ে নেওয়া হয়।

আলাদা পথে পাহাড়ে যায় চারজন

তুহিন জানিয়েছেন, ১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে অপ্রতিমের সঙ্গে তার দেখা হয়। এরপর তিনি অপ্রতিমকে সানন্দা পশ্চিমপাড়ার দিকে নিয়ে যান। জায়গাটি নির্জন এবং সেটি তার চাচা শাহ আলমের পাহাড় বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন তিনি।

অন্যদিকে অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত কিশোর জানিয়েছে, দুপুর দুইটার পর কোটবাড়ি বোর্ড মার্কেট এলাকায় অপ্রতিমের সঙ্গে তার দেখা হয়। পরে সন্ধ্যার আগে সে তার আরেক কিশোর বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে পাহাড়ের দিকে যায়। যাওয়ার আগেই ওই বন্ধুকে হত্যার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়।

তৃতীয় কিশোরের ভাষ্য অনুযায়ী, বিকেল ৩টা ৪০ মিনিটের দিকে একটি স্কুলের সামনে তার বন্ধুর সঙ্গে দেখা হয়। সেখানেই তাকে অপ্রতিমকে হত্যার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়। এরপর বিকেল চারটার পর তারা পাহাড়ের দিকে যায়।

পাহাড়ে পৌঁছে তারা অপ্রতিম ও তুহিনকে একসঙ্গে বসে থাকতে দেখে। পরে চারজন কিছু সময় গল্প ও আড্ডা দেয় বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রথমে নেওয়া হয় অপ্রতিমের আইফোন

হত্যাকাণ্ডের আগে অপ্রতিমের আইফোন নেওয়া হয়েছিল—এ বিষয়ে তিন আসামির বক্তব্যে মিল রয়েছে।

অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত কিশোর জানিয়েছে, সে অপ্রতিমের কাছে ফোনটি চাইলে অপ্রতিম তাকে দেয়। কিছুক্ষণ ব্যবহার করার পর সে ফোনটি তুহিনের হাতে তুলে দেয়।

তুহিনের জবানবন্দিতেও একই ধরনের তথ্য উঠে এসেছে।

এরপর অপ্রতিম ফোনটি ফেরত চাইলে তুহিনের সঙ্গে তার কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। পুলিশের আগের বক্তব্য অনুযায়ী, অপ্রতিম আইফোন ফেরত নেওয়ার চেষ্টা করলে তুহিন বাধা দেন। এরপর মারধরের ঘটনা ঘটে।

প্রথম আঘাতের বর্ণনায় মিল

অপ্রতিমকে প্রথম আঘাত করার বিষয়ে তিন আসামির জবানবন্দিতে তুহিনের নাম এসেছে।

তুহিনের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে তিনি অপ্রতিমকে থাপ্পড় দেন। পরে পাশে থাকা একটি কোদালের হাতল দিয়ে তার মাথায় আঘাত করেন। এরপর অন্য দুজনকে অপ্রতিমকে মারতে বলেন।

অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত কিশোরও জানিয়েছে, তুহিনের সঙ্গে অপ্রতিমের ঝগড়ার একপর্যায়ে তুহিন কোদালের হাতল দিয়ে তার মাথায় প্রথম আঘাত করেন।

তৃতীয় কিশোরের জবানবন্দিতেও তুহিনের হাতে প্রথম আঘাতের একই ধরনের বর্ণনা পাওয়া গেছে।

আইফোন বিক্রি করে টাকা ভাগের পরিকল্পনা

তিন জবানবন্দিতে অপ্রতিমের আইফোন নেওয়ার পাশাপাশি সেটি বিক্রি করে অর্থ ভাগ করে নেওয়ার পরিকল্পনার কথাও এসেছে।

তুহিন জানিয়েছেন, অপ্রতিমের আইফোনের প্রতি তাদের লোভ হয়েছিল।

অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত কিশোর বলেছে, ফোনটি বিক্রির পর পাওয়া অর্থ ভাগ করে নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল।

তৃতীয় কিশোরও জানিয়েছে, আইফোন বিক্রি করে পাওয়া অর্থ থেকে তাকেও ভাগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল।

তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, আইফোন নেওয়া এবং তা বিক্রি করে অর্থ ভাগ করে নেওয়ার উদ্দেশ্যের কথা তিন জবানবন্দিতেই উঠে এসেছে।

হত্যার পর কে কোথায় গিয়েছিল?

অপ্রতিমের মৃত্যুর পর ঘটনাস্থল থেকে কে কোন পথে চলে যায়—এ বিষয়ে তিন আসামির বক্তব্যে কিছু পার্থক্য রয়েছে।

তুহিন জানিয়েছেন, অপ্রতিম মারা যাওয়ার পর অন্য দুজন একদিকে চলে যায়। তিনি অন্যদিকে গিয়ে বাসায় ফেরেন।

দ্বিতীয় জবানবন্দিতে বলা হয়েছে, অপ্রতিম মারা যাওয়ার পর দুই কিশোর একসঙ্গে ঘটনাস্থল থেকে চলে যায়। তখন তুহিন সেখানে ছিলেন।

তৃতীয় কিশোর জানিয়েছে, সে ও তার বন্ধু একসঙ্গে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে এবং তুহিন অন্যদিকে চলে যান।

তবে তিনজনের জবানবন্দিতেই অপ্রতিমের আইফোন শেষ পর্যন্ত তুহিনের কাছে ছিল বলে উল্লেখ রয়েছে।

তুহিনের বন্ধুকে ঘিরে নতুন প্রশ্ন

তুহিনের জবানবন্দিতে তার এক বন্ধুকে নিয়েও নতুন তথ্য উঠে এসেছে।

তুহিন জানিয়েছেন, হত্যার পর বাসায় ফিরে তিনি ওই বন্ধুকে ফোন করে ডেকে আনেন এবং পুরো ঘটনার কথা জানান। এমনকি হত্যার পরিকল্পনার বিষয়েও ওই বন্ধু আগে থেকেই জানতেন বলে তুহিন তার জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন।

তবে অন্য দুই আসামির জবানবন্দিতে হত্যার আগের পরিকল্পনার সঙ্গে তুহিনের ওই বন্ধুর সম্পৃক্ততার কথা পাওয়া যায়নি।

পরে পুলিশ তুহিনের বন্ধুকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেননি; তবে ঘটনার কথা জানার পর তা গোপন করেছিলেন।

পরদিন অপ্রতিমকে খুঁজতে যায় তারা

হত্যার পরদিন আসামিদের কর্মকাণ্ড নিয়েও জবানবন্দিতে আলাদা আলাদা তথ্য পাওয়া গেছে।

তুহিন জানিয়েছেন, পরদিন সকালে অপ্রতিমের মামা তাকে ফোন করে অপ্রতিমের খোঁজ করেন। এরপর তিনি তার বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে কোটবাড়ি এলাকায় অপ্রতিমকে খুঁজতে যান।

অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত কিশোর জানিয়েছে, পরদিন সে অপ্রতিমের বাবার এক সহকারীর সঙ্গে তাকে খুঁজতে বের হয়। পরে মরদেহ উদ্ধারের খবর পেয়ে সেও ঘটনাস্থলে যায়।

তৃতীয় কিশোরের বক্তব্য অনুযায়ী, অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের পর সে ও তার বন্ধু সন্ধ্যায় ফেসবুকে অপ্রতিমের মৃত্যুতে শোক জানিয়ে স্ট্যাটাস দেয়।

এর মধ্যেই পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজসহ বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে তুহিনকে শনাক্ত করে। পরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে অন্যদের সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায় বলে জানিয়েছে পুলিশ।

যেসব প্রশ্নের উত্তর এখনো তদন্তসাপেক্ষ

তিন আসামির জবানবন্দিতে হত্যার পরিকল্পনা ও মূল ঘটনাপ্রবাহের বিভিন্ন বিষয়ে মিল পাওয়া গেলেও কয়েকটি বিষয় এখনো তদন্তাধীন রয়েছে।

হত্যার পরিকল্পনায় কার ভূমিকা কতটা ছিল, ঘটনাস্থলে প্রত্যেকের ভূমিকা কী ছিল, হত্যার পর আইফোনটি কোথায় নেওয়া হয়েছিল এবং এ ঘটনায় আরও কেউ জড়িত ছিল কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখছে তদন্তকারী সংস্থা।

বিশেষ করে তুহিনের জবানবন্দিতে তার এক বন্ধুর নাম আসায় নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। কারণ, অন্য দুই আসামির বক্তব্যে ওই বন্ধুর সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ নেই।

২০ সেপ্টেম্বর তিন আসামি আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার পর পুলিশ জানিয়েছিল, তাদের বক্তব্য অন্যান্য তথ্যপ্রমাণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে।

আদালতে দেওয়া জবানবন্দিগুলোতে হত্যাকাণ্ডের একটি ধারাবাহিক বিবরণ উঠে এলেও এসব তথ্য সাক্ষ্য, সিসিটিভি ফুটেজ ও উদ্ধার হওয়া আলামতের সঙ্গে যাচাই করে দেখা তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা গেছে।