ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিতে এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণকালীন সময়ে বিজ্ঞপ্তি ও নিয়মিত পরীক্ষা ছাড়াই ৮ হাজার ৫৪২ কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংকে মোট ১০ হাজার ৮৩২ জন নিয়োগ পান। এর মধ্যে ৮ হাজার ৯৯ জনই চট্টগ্রাম জেলার বাসিন্দা, যা মোট নিয়োগের প্রায় ৭৫ শতাংশ। তাঁদের মধ্যে ৫ হাজার ১৪৮ জনের বাড়ি এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলমের নিজ উপজেলা চট্টগ্রামের পটিয়ায়। অর্থাৎ ওই সময়ে ব্যাংকটির মোট নিয়োগের প্রায় ৪৮ শতাংশ হয়েছে একটি উপজেলা থেকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে বলা হয়েছে, প্রয়োজন বিবেচনা না করে ব্যক্তিস্বার্থনির্ভরভাবে এসব নিয়োগ দেওয়ার ফলে ব্যাংকের বেতন ব্যয় বেড়েছে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানে আঞ্চলিক ভারসাম্যহীনতা ও কেন্দ্রীভূত ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এর কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের যোগ্য ও মেধাবী প্রার্থীরা চাকরির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, প্রকৃত পরিস্থিতি জানতে কমিটি গঠন করা হয়েছিল। প্রতিবেদনে যে তথ্য এসেছে, প্রয়োজন হলে তার ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যেহেতু নিয়োগ ও চাকরিচ্যুতির সিদ্ধান্ত ব্যাংক নিজেই নিয়েছে, তাই বাংলাদেশ ব্যাংকের সরাসরি সম্পৃক্ততার সুযোগ সীমিত।
বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই ১৬ ধাপে নিয়োগ
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ১৬টি ধাপে কোনো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ছাড়াই জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়। এ অনিয়ম শুধু প্রাথমিক পর্যায়ের পদে সীমাবদ্ধ ছিল না; ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি), অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি), উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি), সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট (এসইভিপি)সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদেও একই প্রক্রিয়ায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
ইসলামী ব্যাংকের মানবসম্পদ নীতিমালা অনুযায়ী, যেকোনো পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে কমপক্ষে দুটি জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ এবং পরীক্ষা নেওয়ার নিয়ম রয়েছে। তবে ২০১৭ সালে এস আলম গ্রুপ ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর নীতিমালায় জরুরি পরিস্থিতিতে বিশেষ শিথিলতার সুযোগ যুক্ত করা হয়। পরে এই সুযোগ ব্যবহার করে বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই নিয়োগ দেওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশেষ বাক্সে সংগ্রহ করা হতো সিভি
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসলামী ব্যাংকে নিয়োগের জন্য চাকরিপ্রার্থীদের জীবনবৃত্তান্ত সংগ্রহ করা হতো এস আলমের চট্টগ্রামের পটিয়ার বাড়ি এবং আছদগঞ্জের ব্যবসায়িক কার্যালয়ে রাখা বিশেষ বাক্সের মাধ্যমে।
‘পটিয়া জেনারেল’, ‘পটিয়া ক্যাশ’, ‘পুরুষ জেনারেল (সাতকানিয়া-লোহাগড়া)’, ‘মহিলা ক্যাশ’, ‘পিয়ন-ডিপ্লোমা’সহ বিভিন্ন নামে এসব বাক্স রাখা হয়েছিল। সেখান থেকে বাছাই করা প্রার্থীদের তালিকা ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হতো এবং পরে নিয়োগপত্র দেওয়া হতো।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত প্রার্থীদের লিখিত বা মৌখিক পরীক্ষার কোনো মূল্যায়নপত্র ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগে পাওয়া যায়নি।
প্রবেশনারি অফিসার নিয়োগেও অনিয়মের অভিযোগ
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রবেশনারি অফিসার পদেও নিয়ম ভেঙে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ২০১৯ সালের ২৪তম প্রবেশনারি অফিসার ব্যাচ এর একটি উদাহরণ।
ওই ব্যাচে কোনো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়নি। চট্টগ্রাম থেকে সংগ্রহ করা ৭৮০ জন প্রার্থীর সিভি পরীক্ষা নেওয়ার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে (আইবিএ) পাঠানো হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, লিখিত পরীক্ষায় পাস নম্বর ৫০ শতাংশ নির্ধারিত থাকলেও চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রার্থীদের সুবিধার জন্য তা কমিয়ে ২০ শতাংশ করা হয়। এতে ৫৪০ জন মৌখিক পরীক্ষার জন্য নির্বাচিত হন। মৌখিক পরীক্ষায় ৩০৪ জন উত্তীর্ণ হন।
এ ছাড়া লিখিত পরীক্ষায় অংশ না নেওয়া ১২ জনের সিভিও সরাসরি মৌখিক পরীক্ষার বোর্ডে দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে ৩১৬ জনের মধ্যে ১৯০ জন ইসলামী ব্যাংকে এবং ১২৬ জন ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে নিয়োগ পান। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাদের সবার বাড়ি চট্টগ্রামে।
চাকরিচ্যুতি প্রক্রিয়া নিয়েও তদন্ত
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ইসলামী ব্যাংকের নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা হয়। এরপর ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের যোগ্যতা যাচাইয়ের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএর মাধ্যমে বিশেষ মূল্যায়ন পরীক্ষা নেওয়া হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ওই পরীক্ষায় প্রাথমিকভাবে ৫ হাজার ৩৭৩ জনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর মধ্যে ৪০২ জন পরীক্ষায় অংশ নেন এবং সবাই উত্তীর্ণ হন। অন্যদিকে ৪ হাজার ৯৭২ জন পরীক্ষায় অংশ নেননি।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরীক্ষায় অংশ না নেওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কর্মবিরতি, কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শন, ব্যাংকের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ও অসত্য তথ্য প্রচারের অভিযোগ আনা হয়। তবে কোনো অভিযোগ গঠন না করে তিন মাসের বেতন দিয়ে তাঁদের চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, একই সময়ে নিয়োগ পাওয়া ২৬১ জনকে মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার বাইরে রেখে চাকরিতে বহাল রাখা হয়। মানবসম্পদ বিভাগের পক্ষপাতমূলক আচরণের কারণেও অনেকে চাকরি হারিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সূত্র: প্রথম আলো





