যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ দুই নৌপথ হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের মধ্যে পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী তেলবাহী ট্যাঙ্কার ও বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা বেড়েছে। এতে ওই অঞ্চল থেকে জ্বালানি রপ্তানি কমে যাওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থা চাপের মুখে পড়েছে।
ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ সংস্থা ইউকে মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনসের (ইউকেএমটিও) তথ্য অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে হরমুজ প্রণালি ও আশপাশের এলাকায় জাহাজ লক্ষ্য করে অন্তত ১২টি হামলার খবর পাওয়া গেছে।
সিএনএনের যাচাই করা ভিডিওতে দেখা গেছে, ১৩ অক্টোবর অজ্ঞাত প্রজেক্টাইলের আঘাতে সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী কনটেইনার জাহাজ ‘জিএফএস প্রাইড’ ডুবে যাচ্ছে। একই সপ্তাহের শুরুতে পৃথক ঘটনায় আরও দুটি পণ্যবাহী জাহাজ ডুবে যাওয়ার খবর পাওয়া যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে হরমুজ প্রণালি দিয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল পরিবহন অব্যাহত থাকার পর ওই নৌপথে হামলা আরও জোরদার করেছে ইরান।
সংকটের মধ্যেও তেল সরবরাহ সচল রাখতে মার্কিন সামরিক বাহিনী বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর আওতায় জাহাজের অবস্থান শনাক্তকারী ব্যবস্থা বন্ধ রেখে চলাচল করা ট্যাঙ্কারগুলোকে ওমান উপসাগরে অপেক্ষমাণ অন্য জাহাজে তেল পৌঁছে দিতে সহায়তা করা হয়েছে। এ ধরনের চলাচলকে ‘ডার্ক ট্রানজিট’ বলা হচ্ছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধের কারণে নিজেদের তেলবাহী ট্যাঙ্কার হরমুজ প্রণালি দিয়ে পার করতে ইরানকে সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে।
আট মাস ধরে চলা সংঘাতের প্রভাব ইয়েমেনেও ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে সৌদি আরব ও ইরান-সমর্থিত হুতি যোদ্ধাদের মধ্যে উত্তেজনা বেড়েছে। হুতিরা বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী সৌদি তেলবাহী জাহাজে হামলা চালিয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও প্রাণঘাতী হামলার খবর পাওয়া গেছে।
ইউরোপীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান ব্রুগেলের জ্যেষ্ঠ ফেলো জর্জ জাখমান সিএনএনকে বলেন, চলমান সংকট বিশ্ববাজারে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। তেল আমদানিকারক দেশগুলো বুঝতে পারছে, বাইরের সরবরাহ সংকট মোকাবিলায় জ্বালানি তেলের ব্যবহার কাঠামোগতভাবে কমানোর প্রয়োজন রয়েছে।
হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতার কারণে বিকল্প নৌপথ হিসেবে বাব আল-মান্দেবের গুরুত্ব বেড়েছিল। কিন্তু সেখানেও নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হওয়ায় তেল পরিবহন নতুন সংকটে পড়েছে।
জ্বালানি বাজার বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান এনার্জি অ্যাসপেক্টসের সহপ্রতিষ্ঠাতা রিচার্ড ব্রোঞ্জ জানান, সর্বোচ্চ সরবরাহের সময় সৌদি আরবের লোহিত সাগরসংলগ্ন ইয়ানবু বন্দর থেকে প্রতিদিন প্রায় ৪৫ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি হতো। এর মধ্যে প্রায় ৩০ লাখ ব্যারেল পরিবহন করা হতো বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে।
তবে গ্রীষ্মকালে হুতিদের হামলার হুমকি বেড়ে যাওয়ায় ওই নৌপথে তেল সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
জ্বালানি বাজার বিশ্লেষক সংস্থা কেপলারের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক জোহানেস রউবাল সতর্ক করে বলেছেন, হুতিদের হামলার ঝুঁকি যদি সব দেশের বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য বিস্তৃত হয়, তাহলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর ফলে দাম নতুন করে বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে গত মাসে ইরাকের ভেতর থেকে চালানো ড্রোন হামলায় সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। লোহিত সাগরের বন্দরগুলোতে অপরিশোধিত তেল পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই পাইপলাইনে হামলার পর বিকল্প রপ্তানি ব্যবস্থা গ্রহণ করে রিয়াদ।
মার্কিন সামরিক সহায়তায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল রপ্তানি বাড়ানোর উদ্যোগ নেয় সৌদি আরব।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওই পাইপলাইনে হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করেছেন। তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। পরবর্তী কয়েকটি প্রতিবেদনে পাইপলাইনটি আবার চালু হওয়ার তথ্য জানানো হয়েছে।
চলমান জ্বালানি সংকটে সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর নির্ভরশীল এশীয় দেশগুলো। বিশেষ করে সৌদি আরব থেকে বিপুল পরিমাণ তেল আমদানি করা দেশগুলো সরবরাহ কমে যাওয়ার প্রভাব মোকাবিলায় জ্বালানির ব্যবহার ও আমদানি সমন্বয়ের চেষ্টা করছে।
চীনও কৌশলগত তেলের মজুত ব্যবহার করে আমদানি কমিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ নতুন পাইপলাইন নির্মাণ ও বিকল্প রপ্তানি পথ তৈরির পরিকল্পনা করছে, যাতে গুরুত্বপূর্ণ প্রণালিগুলোর ওপর নির্ভরতা কমানো যায়।
জোহানেস রউবালের মতে, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বিকল্প পরিবহনব্যবস্থা গড়ে ওঠার সুযোগ বাড়বে। এতে তেল সরবরাহের ওপর ইরানের প্রভাব ধীরে ধীরে কমতে পারে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হতে পারে।