বিশ্বের অন্যতম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) হাব হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলতে ২০২৬ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত মেয়াদি নতুন কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেছে তুরস্ক। প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতা অর্জন, নিজস্ব এআই সক্ষমতা বাড়ানো এবং কৌশলগত খাতে এ প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণকে সামনে রেখে এ রোডম্যাপ তৈরি করা হয়েছে।
মঙ্গলবার তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোয়ান ‘২০২৬–২০৩০ তুরস্ক এআই অ্যাকশন প্ল্যান’ সংক্রান্ত সার্কুলারে স্বাক্ষর করেন। পরে সেটি দেশটির সরকারি গেজেটে প্রকাশ করা হয়।
শিল্প ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে তৈরি কর্মপরিকল্পনাটিতে প্রযুক্তিগত সার্বভৌমত্ব ও টেকসই ডিজিটাল রূপান্তরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তুরস্কের এআই খাতের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনাটি চারটি প্রধান স্তম্ভের ওপর সাজানো হয়েছে—সচেতনতা, ব্যবহার, উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনা। এর মাধ্যমে দেশজুড়ে একটি নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য ও শক্তিশালী এআই ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে চায় আঙ্কারা।
৫০ লাখ নাগরিককে এআই প্রশিক্ষণ
কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী দুই বছরের মধ্যে তুরস্কের ৮১টি প্রদেশের ৫০ লাখ নাগরিককে এআই বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে ১০ হাজার উচ্চপর্যায়ের এআই বিশেষজ্ঞ এবং ১ লাখ এআই প্রয়োগকারী পেশাজীবী তৈরির জন্য জাতীয় পর্যায়ে প্রতিভা উন্নয়ন কর্মসূচি চালু করা হয়েছে।
সরকার অন্তত ২ হাজার সরকারি ডেটাসেট প্রস্তুতেরও পরিকল্পনা করেছে। পাশাপাশি এআই ব্যবহারে নাগরিক ও ব্যবহারকারীদের অধিকার সুরক্ষায় আইনগত ও নৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কম্পিউটিং সক্ষমতায় বড় বিনিয়োগ
২০৩০ সালের মধ্যে তুরস্কের ডেটা সেন্টারগুলোর মোট স্থাপিত কম্পিউটিং সক্ষমতা ১ গিগাওয়াটে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
গবেষক, স্টার্টআপ ও ক্ষুদ্র ব্যবসাকে এআই গবেষণা ও উদ্ভাবনে সহায়তা দিতে ২ কোটি জিপিইউ-আওয়ার বরাদ্দের পরিকল্পনাও রয়েছে।
সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের বিনিয়োগ বাজেটের অন্তত ২ শতাংশ এআই প্রকল্পে ব্যয়ের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য, জ্বালানি ও স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিংসহ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত কয়েকটি খাতে ইতোমধ্যে পরীক্ষামূলক এআই প্রকল্প চালু করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য ক্যাম্পাসে থাকা জ্বালানি ও অবকাঠামোগত সুবিধা কাজে লাগিয়ে ‘এআই গ্রোথ জোন’ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাও রয়েছে।
দেশীয় উদ্যোগে অর্থায়নের জন্য এআই গবেষণা তহবিল ও গ্রোথ ফান্ড গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তুরস্কের ডেভেলপারদের নিজস্ব খাতভিত্তিক ভাষা মডেল ও রোবটিক প্রযুক্তি তৈরি এবং সেগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানিতে উৎসাহ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
১০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের লক্ষ্য
নতুন কর্মপরিকল্পনার আওতায় বেসরকারি খাতের নেতৃত্বে অন্তত ১০ বিলিয়ন ডলারের এআই ও ডেটা সেন্টার বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্য নিয়েছে তুরস্ক।
পাশাপাশি ওইসিডি, জি২০ এবং জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে এআই-সংক্রান্ত নীতিনির্ধারণী আলোচনায় সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়াতে তুর্কি ভাষাভাষী দেশগুলোর জন্য একটি অভিন্ন বৃহৎ ভাষা মডেল (এলএলএম) তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া অন্তত পাঁচটি অগ্রাধিকার খাতে নিয়ন্ত্রক ‘স্যান্ডবক্স’ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
তুরস্কের শিল্প ও প্রযুক্তিমন্ত্রী মেহমেত ফাতিহ কাচির বলেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক হয়ে উঠছে। এ কারণে বৈশ্বিক এআই রূপান্তরে তুরস্ক দর্শকের ভূমিকায় না থেকে অগ্রণী ভূমিকা নিতে চায়।
তার ভাষ্য, নিজস্ব মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিশ্বাসযোগ্য এআই পণ্য ও সেবা তৈরি এবং কৌশলগত খাতে সেগুলোর ব্যাপক ব্যবহার নিশ্চিত করতে চায় তুরস্ক। এর মাধ্যমে দেশের উন্নয়নের পাশাপাশি মানবকল্যাণেও এআইয়ের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর লক্ষ্য রয়েছে।
সূত্র: টিআরটি ওয়ার্ল্ড





