আশ্বিন এলেই আমার কেন যেন মনে হয়, প্রকৃতি একটু থেমে দাঁড়িয়েছে। বর্ষার টানা বৃষ্টির পর আকাশটা পরিষ্কার হয়ে যায়। নীল আকাশে সাদা মেঘ ভেসে বেড়ায়। মাঠের পাশে কাশফুল দুলতে থাকে। বাঁশঝাড়ের মাথায় সাদা বক এসে বসে।

ভোরের ঘাসে জমে থাকা শিশির আর শিউলির গন্ধে চারপাশে তৈরি হয় অন্যরকম এক অনুভূতি। মনে হয়, শরৎ চুপিচুপি এসে দরজায় দাঁড়িয়েছে।

আশ্বিনের সৌন্দর্য খুব বেশি আয়োজনের নয়। একটু নীল আকাশ, দু-একটি সাদা মেঘ, বাঁশঝাড়ে বসে থাকা বক, মাঠের ধারে কাশফুল–এই সামান্য দৃশ্যগুলোই মন ভালো করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। প্রকৃতি যেন এই সময়টায় খুব সহজভাবেই সুন্দর হয়ে ওঠে।

ছোটবেলায় এই সৌন্দর্যগুলো আরও কাছের ছিল। কাশফুল দেখলেই কাছে ছুটে যেতাম। শিউলি কুড়াতে গিয়ে কখন যে সকাল পেরিয়ে যেত, তা বুঝতাম না। বিকেলে মাঠের দিকে তাকিয়ে থাকা, বাঁশঝাড়ে বসে থাকা বক দেখা কিংবা আকাশের মেঘে নিজের মতো গল্প খুঁজে নেওয়া—এসবই ছিল আনন্দের অংশ।

তখন প্রকৃতিকে উপভোগ করার জন্য আলাদা কোনো পরিকল্পনা করতে হতো না। প্রকৃতিই ছিল আমাদের প্রতিদিনের জীবনের অংশ।

এখন সময় বদলেছে। ব্যস্ততা বেড়েছে, জীবনের হিসাবও বেড়েছে। শহরের ব্যস্ত রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে কখন যে আশ্বিন চলে আসে, অনেক সময় টেরই পাওয়া যায় না। চারপাশে এত কিছু থাকার পরও কোথাও যেন সেই আগের সরল আনন্দটা নেই।

তবু আশ্বিন তার পুরোনো অভ্যাস ছাড়েনি। কোনো এক সকালে জানালার বাইরে নীল আকাশ দেখি, দূরে সাদা মেঘ ভাসে–হঠাৎ মনে পড়ে যায় শৈশবের কথা। কোথাও কাশফুল দেখলে মনে হয়, অনেক দিন পর পরিচিত কারও সঙ্গে দেখা হলো। বাঁশঝাড়ে সাদা বক বসে থাকতে দেখলে মনে হয়, সময় বুঝি একটু পিছিয়ে গেছে।

শিউলির গন্ধে ফিরে আসে এমন কিছু সকাল, যেগুলো সময়ের সঙ্গে হারিয়ে গেছে, কিন্তু মন থেকে কখনো মুছে যায়নি।

হয়তো এ কারণেই আশ্বিন আমার কাছে শুধু একটি মাস নয়। এটি ফিরে তাকানোর একটি সুযোগ। ব্যস্ত জীবনের ভিড় থেকে কয়েক মুহূর্ত সরে গিয়ে মনে করার সুযোগ–একসময় আমরা কত অল্পতেই আনন্দ খুঁজে পেতাম, কত সহজেই একটি বিকেল আমাদের মন ভালো করে দিতে পারত।

আশ্বিনের এই সাদা চিঠির উত্তর হয়তো কখনো লেখা যায় না; শুধু নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলা যায়–“আমি এখনো তোমার সেই হারিয়ে যাওয়া বিকেলগুলোর অপেক্ষায় আছি।”

 

মোঃ সাজ্জাদুর রহমান সাকিব

শিক্ষার্থী: সরকারি তিতুমীর কলেজ