বলছিলাম চিঠি নিয়ে। ডিজিটাল যোগাযোগের এই সময়ে চিঠি আর নিত্যদিনের প্রয়োজন নয়। তবু একটি খাম, কয়েকটি হাতে লেখা শব্দ আর প্রেরকের নামের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে যে অপেক্ষা ও ভালোবাসা তার আবেদন কি কখনো ফুরিয়ে যায়?
আমি জেন-জি প্রজন্মের একজন সদস্য । আমাদের বেড়ে ওঠার সঙ্গেই বদলে গেছে যোগাযোগের ধরণ , গল্প বলার ভঙ্গিমা । অ্যান্টেনাওয়ালা সিটিসেল ফোন থেকে শুরু করে আজকের অত্যাধুনিক স্মার্টফোন ,প্রযুক্তির পূর্ণ যাত্রার সাক্ষী আমরা। মুহূর্তের মধ্যে বার্তা পাঠানো, ভিডিও কলে কথা বলা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনুভূতি প্রকাশ করাই আমাদের কাছে স্বাভাবিক। তাই ডাকপিয়নের হাতে আসা চিঠির খাম কখনো আমার নামে এসে পৌঁছায়নি।
চিঠির সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় স্কুলের পাঠ্যবইয়ে। পরীক্ষার প্রশ্নে প্রায়ই লেখা থাকতো, “তোমার বন্ধুকে শুভেচ্ছা জানিয়ে একটি চিঠি লেখো।” তখন আমার কাছে চিঠি মানে ছিল পরীক্ষার হলে নম্বর পাওয়ার জন্য শেখা একটি বিরক্তিকর পাঠ। ওপরে ঠিকানা ও তারিখ, মাঝখানে সম্বোধন, শেষে ‘ইতি’ লিখে প্রেরকের নাম , তখন পর্যন্ত চিঠি সম্পর্কে আমার জানাশোনার পরিধি ছিল এটুকুই।
আরও একটু বড় হওয়ার পর জানলাম চিঠি কী এবং কেন লেখা হতো, কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠানিক ঠিকানার সঙ্গে পোস্ট অফিসের নাম কেন যুক্ত থাকে, সেটি তখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারিনি। ভাইবোনদের কাছে শুনেছিলাম, একসময় তারা ডাকটিকিট সংগ্রহ করত। বিভিন্ন দেশ ও সময়ের ডাকটিকিট নিয়ে মানুষের কত আগ্রহ ছিল! কিন্তু ডাকটিকিট কিংবা ডাকঘরের সঙ্গে আমার প্রজন্মের সম্পর্ক কখনোই তেমন ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেনি।
এবারের রাজধানীর সরকারি তিতুমীর কলেজের। কলেজের প্রধান ফটকে ঢুকতেই প্রথম যে জিনিসটার উপর চোখে পড়েছিল, সেটি ছিল পুরোনো একটি ডাকবাক্স। জংধরা, বিবর্ণ, জরাজীর্ণ সেই লাল ডাকবাক্সটি যেন ক্যাম্পাসের দীর্ঘ ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।ক্যম্পাসের অনেক পুরনো স্মৃতি বিজড়িত ছবিতে উপস্থিতি ছিল এই ডাকবক্সের।
প্রতিদিন হাজারো শিক্ষার্থী তার পাশ দিয়ে যাতায়াত করত। কিন্তু শুধু চিঠি দিবস ছাড়া এটি খুব বেশি আলোচনা হতো না। চিঠি দিবস এলে কেউ কেউ ডাকবাক্সটির সঙ্গে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিতেন, কলেজের সাংবাদিকদের লেখা বিভিন্ন ফিচারে উঠে আসত তার সৌন্দর্য ও ঐতিহ্যের কথা। সেই কয়েকটি দিন ছাড়া বছরের বাকি সময় সে প্রায় নিঃসঙ্গই থাকত।
এ বছরের শুরুর দিকে একদিন হঠাৎ খেয়াল করলাম, কলেজ ফটকের সেই পরিচিত লাল বক্সটি আর নেই। জংধরা পুরোনো ডাকবাক্সটি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বিষয়টি হয়তো অনেকের চোখে পড়েছিল, হয়তো পড়েনি। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছিল, ক্যাম্পাসের পরিচিত কোন ইতিহাস যেন হঠাৎ নিখোঁজ ।
সপ্তাহ কয়েক আগে ক্যাম্পাসে ডাক বিভাগের একটি গাড়ি দেখে কৌতূহলী হয়ে এগিয়ে গেলাম। দেখলাম, দুইজন কর্মী নতুন, ঝকঝকে একটি লাল ডাকবাক্স নিয়ে এসেছেন। অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে সেটি নির্ধারিত স্থানে বসাচ্ছিলেন তাঁরা।
নতুন ডাকবাক্সটি দেখে আনন্দে একজনকে বললাম,
“মামা, ডাকবাক্সটিকে খুব মিস করছিলাম। আবার দেখে সত্যিই ভালো লাগছে।”
তিনি হেসে বললেন,
“দেখে আর কী হবে? আপনারা তো চিঠি লিখতেই জানেন না!”
কথাটি শুনে মুহূর্তেই থমকে গেলাম। আসলেই তো , আমরা কি এখনো চিঠি লিখতে জানি?
আমরা জানি কীভাবে কয়েক সেকেন্ডে একটি বার্তা পাঠাতে হয়। জানি কীভাবে একটি ইমোজির মাধ্যমে হাসি, কান্না কিংবা ভালোবাসা প্রকাশ করতে হয়। কিন্তু সাদা পাতার সামনে বসে ধীরে ধীরে মনের কথা লেখার অভ্যাস কি আমাদের আছে? একটি চিঠি লেখার আগে সারাদিন ধরে কথাগুলো ভাবা, প্রতিটি বাক্য যত্ন করে সাজানো, খামের ভেতর আবেগ ভরে ডাকবাক্সে ফেলে আসা-এসব অভিজ্ঞতা আমাদের জীবনে প্রায় নেই।
একসময় মানুষ চিঠির উত্তরের জন্য দিনের পর দিন অপেক্ষা করত। ডাকপিয়নের সাইকেলের ঘণ্টা কিংবা হাঁক শুনলেই ছুটে যেত বাড়ির দরজায়। পরিচিত হাতের লেখা দেখেই চিনে ফেলত প্রেরককে। কোনো চিঠির পাতায় থাকত আনন্দ, কোনো পাতায় অভিমান; কোথাও ভালোবাসা, কোথাও হারানোর বেদনা । কখনো একটি চিঠি বারবার পড়া হতো, কখনো তা বইয়ের ভাঁজে কিংবা পুরোনো ট্রাঙ্কের ভেতর সযত্নে তুলে রাখা হতো।
আজ আমাদের কাছে যোগাযোগ অনেক সহজ, কিন্তু অপেক্ষা নেই। বার্তা আছে, অথচ অনেক সময় গভীরতা নেই। শব্দ আছে, কিন্তু সেই শব্দে হাতের স্পর্শ নেই।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই সময়ে মানুষ হয়তো একদিন লিখতেই ভুলে যাবে। কয়েকটি লাইনের বেশি পড়ার ধৈর্যও হারিয়ে ফেলবে। হারিয়ে যাবে চিঠি লেখার ভাষা, খামের ভাঁজে জমে থাকা গন্ধ এবং ‘ইতি’ শব্দটির গভীরতা। একটি প্রজন্মের সংগ্রহে থাকা অসংখ্য ডাকটিকিট, প্রিয়জনের হাতের লেখা এবং পুরোনো চিঠির স্মৃতি হয়তো পরবর্তী প্রজন্ম পর্যন্ত পৌঁছাবে না।
তারপরও চিঠির প্রাসঙ্গিকতা আরও কয়েকটি যুগ টিকে থাকুক। ডাকপিয়নের পরিচিত হাঁক না থাকলেও ডাকবাক্সগুলো দাঁড়িয়ে থাকুক মানুষের অপেক্ষা ও ভালোবাসার স্মারক হয়ে। আমরা হয়তো নিয়মিত চিঠি লিখব না, তবু কোনো এক বিকেলে প্রিয় কাউকে মনে করে সাদা কাগজে কয়েকটি কথা চাইলে লিখতেই পারি।
একটি খামের ভেতর বন্দি থাকুক কিছু না বলা অনুভূতি। পাতাজুড়ে থাকুক আনন্দ, বেদনা, অভিমান ও অশ্রু। আর চিঠির শেষে ‘ইতি’র পাশে লেখা থাকুক গভীর স্নেহভরা কোনো প্রেরকের নাম। যাতে বহু বছর পর কোনো পুরোনো ব্রিফকেস খুলে কেউ অবাক হয়ে বলতে পারে
“একটি চিঠি ছিল!”
খন্দকার হিমেল //





