ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোতে (ডিআর কঙ্গো) দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে ইবোলা ভাইরাস। সংক্রমণের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে এবারের প্রাদুর্ভাব ইবোলার ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম গেব্রেয়েসুস।

তার আশঙ্কা, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এলে ২০১৪ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত পশ্চিম আফ্রিকায় ছড়িয়ে পড়া ভয়াবহ ইবোলা মহামারির প্রাণহানির সংখ্যাও ছাড়িয়ে যেতে পারে। ওই মহামারিতে অন্তত ১১ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।

ডিআর কঙ্গোয় এবারের প্রাদুর্ভাব আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয় গত ১৫ মে। এখন পর্যন্ত অন্তত ৪ হাজার ৩০০ জনের শরীরে ভাইরাসটি শনাক্ত হয়েছে এবং মৃত্যু হয়েছে দুই হাজারের বেশি মানুষের।

বুধবার (১২ আগস্ট) ডব্লিউএইচও জানায়, আগামী তিন মাসের মধ্যে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে সংস্থাটি। তবে এই সময়ের মধ্যে প্রাদুর্ভাব পুরোপুরি নির্মূল হবে—এমন প্রত্যাশা করা হচ্ছে না। আপাতত ভাইরাসের বিস্তার ঠেকানোই প্রধান লক্ষ্য।

স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে প্রাদুর্ভাবের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এলেও ভাইরাসটির সংক্রমণ শুরু হয়েছিল আরও আগে।

প্রাদুর্ভাবের কেন্দ্রের কাছাকাছি বুনিয়া শহরে এক সংবাদ সম্মেলনে ডব্লিউএইচওর আফ্রিকা অঞ্চলের পরিচালক ড. মোহামেদ জানাবি বলেন, ‘আমরা ভাইরাসটির পেছনে ছুটছি, কিন্তু ভাইরাস আমাদের চেয়ে এগিয়ে আছে।’

তিনি জানান, গবেষণায় ফেব্রুয়ারি থেকেই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। শুরুর দিকে অনেক রোগীকে ম্যালেরিয়া বা টাইফয়েডে আক্রান্ত হিসেবে ভুল শনাক্ত করা হয়েছিল। এতে প্রকৃত রোগ শনাক্ত হওয়ার আগেই ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পায়।

এবারের সংক্রমণের জন্য বান্দিবুগিও প্রজাতির ইবোলা ভাইরাসকে দায়ী করা হচ্ছে। এর আগে ২০০৭ ও ২০১২ সালে এই প্রজাতির ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা গিয়েছিল। বর্তমানে এ প্রজাতির ইবোলার বিরুদ্ধে কোনো অনুমোদিত টিকা বা স্বীকৃত নির্দিষ্ট চিকিৎসা না থাকায় পরিস্থিতি সামাল দেওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।

এর সঙ্গে ডিআর কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলের অস্থিতিশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতিও স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করছে। ড. জানাবির ভাষ্য অনুযায়ী, নিরাপত্তা ও অন্যান্য সমস্যার কারণে স্বাস্থ্যকর্মীরা আক্রান্ত রোগীদের মাত্র প্রায় ৩০ শতাংশের কাছে পৌঁছাতে পারছেন।

ইবোলা বিরল হলেও অত্যন্ত প্রাণঘাতী ভাইরাসজনিত রোগ। সংক্রমণের দুই থেকে ২১ দিনের মধ্যে উপসর্গ প্রকাশ পেতে পারে। শুরুতে জ্বর, মাথাব্যথা ও তীব্র ক্লান্তির মতো লক্ষণ দেখা দেয়। এসব উপসর্গ ফ্লু বা ম্যালেরিয়ার সঙ্গে মিল থাকায় প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে।

পরবর্তী সময়ে বমি ও ডায়রিয়া দেখা দিতে পারে। গুরুতর অবস্থায় শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ বিকল হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত, বমি বা অন্য সংক্রমিত শারীরিক তরলের সরাসরি সংস্পর্শে এলে ভাইরাসটি একজন থেকে আরেকজনে ছড়াতে পারে।

এদিকে বান্দিবুগিও প্রজাতির ইবোলার বিরুদ্ধে সম্ভাব্য টিকা তৈরির কাজও এগোচ্ছে। যুক্তরাজ্যের ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা এমএইচআরএ একটি টিকার প্রথম মানবপরীক্ষার অনুমোদন দিয়েছে।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা টিকাটি তৈরি করছেন। এতে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার কোভিড-১৯ টিকায় ব্যবহৃত প্রযুক্তির ভিত্তিতে কাজ করা হচ্ছে। পাশাপাশি আরও তিনটি গবেষক দল এই প্রজাতির ইবোলার বিরুদ্ধে ভিন্ন টিকা তৈরির চেষ্টা করছে। তবে সেগুলো এখনো ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

ডব্লিউএইচওর অর্থায়নে ডিআর কঙ্গোয় পৃথক একটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালও চলছে। সেখানে আগে থেকে ব্যবহৃত দুটি অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা ইবোলা রোগীদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়াতে পারে কি না, তা পরীক্ষা করা হচ্ছে।

দ্রুত সংক্রমণ, উচ্চ মৃত্যুহার, কার্যকর অনুমোদিত টিকার অনুপস্থিতি এবং দুর্গম ও অস্থিতিশীল এলাকায় রোগীদের কাছে স্বাস্থ্যকর্মীদের সীমিত প্রবেশাধিকারের কারণে ডিআর কঙ্গোর ইবোলা পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে।

সূত্র: বিবিসি