রংপুর নগরীতে সাবেক স্কুলশিক্ষকসহ একই পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনায় নতুন তথ্য সামনে এসেছে। নিহত চারজনের মুখমণ্ডল ঝলসানো ছিল এবং সেখান থেকে দাহ্য পদার্থের আলামত পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তদন্তসংশ্লিষ্টদের ধারণা, হত্যার আগে বা পরে তাদের মুখে দাহ্য পদার্থ ছিটিয়ে ঝলসে দেওয়া হয়ে থাকতে পারে।
গত শনিবার (২২ আগস্ট) রাত সাড়ে ১১টার দিকে নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকার একটি তালাবদ্ধ বাড়ি থেকে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহতরা হলেন রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ওরফে জুয়েল (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ভোলা (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী পার্থী (২৫) এবং ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তী (১২)।
রোববার সন্ধ্যায় রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে নগরীর দখিগঞ্জ শ্মশানে তাদের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। স্বজনেরা জানান, দাহ করার আগে চারজনের মুখমণ্ডল ঝলসানো অবস্থায় দেখতে পান তারা।
মামলার বাদী ও নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বলেন, নিহতদের মুখমণ্ডলে দাহ্য পদার্থ ব্যবহারের বিষয়টি তারা মরদেহ পাওয়ার পর জানতে পারেন।
তিনি আরও জানান, গণপতি মাছুয়াপাড়ায় নিজের তিনতলা বাড়িতে বসবাস করতেন। বাড়িটির দ্বিতীয় তলার কাজ শেষ হয়েছিল এবং অসম্পূর্ণ অংশে নির্মাণকাজ শুরুর প্রস্তুতি চলছিল। এ নিয়ে আগে চাঁদা দাবির কথাও গণপতি তাকে জানিয়েছিলেন বলে দাবি করেন গোপীনাথ।
তিনি বলেন, ‘আমার ভাই ও তার পরিবারের সদস্যদের খুব কষ্ট দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। আমি ঘাতকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’
নিহত প্রীতিলতার ছোট বোন পূজা রানীও দাবি করেন, মরদেহ হস্তান্তরের পর তারা চারজনের মুখ ঝলসানো দেখতে পান। তার ভাষ্য, হত্যার আগে বা পরে দাহ্য পদার্থ ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে। ঘটনাটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলেও সন্দেহ প্রকাশ করেন তিনি।
এ বিষয়ে রংপুর মেট্রোপলিটন কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল কাদের বলেন, নিহতদের মুখমণ্ডলে দাহ্য পদার্থের আলামত পাওয়া গেছে। নমুনা পরীক্ষার জন্য সিআইডির ফরেনসিক বিভাগে পাঠানো হবে।
রংপুর সিআইডির পুলিশ সুপার (ভারপ্রাপ্ত) সুমিত চৌধুরীও জানান, চারটি মরদেহের মুখমণ্ডল ঝলসানো ছিল। কী ধরনের রাসায়নিক বা দাহ্য পদার্থ ব্যবহার করা হয়েছে, তা পরীক্ষার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে।
দুই যুবকের জবানবন্দি
পুলিশ জানায়, চারজনকে হত্যার ঘটনায় শনিবার রাতে প্রতিবেশী সিদ্ধার্থ দাস (২৩) ও মুগ্ধ দাসকে (১৯) আটক করা হয়। পরে রোববার রাতে রংপুর চিফ মেট্রোপলিটন আদালত-২-এ তারা জবানবন্দি দেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মিলন চ্যাটার্জি জানিয়েছেন, বিচারক রফিকুল ইসলামের কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে তারা হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন।
রোববার এক সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার আবদুল মাবুদ বলেন, গ্রেপ্তার দুই যুবক বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনের সময় গণপতি চক্রবর্তীর নজরে পড়েন। পুলিশ কমিশনারের ভাষ্য অনুযায়ী, গণপতি তাদের চিনে ফেলায় প্রথমে তাকে এবং পরে পরিবারের অন্য তিন সদস্যকে হত্যা করা হয়।
তিনি আরও দাবি করেন, হত্যার পর ঘটনাটিকে ডাকাতি হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়। এ জন্য ঘরের বিভিন্ন জিনিসপত্র এলোমেলো করে রাখা হয়েছিল, যাতে তদন্ত ভিন্ন দিকে যায়।
স্বর্ণালংকার উদ্ধারের স্থান নিয়ে ভিন্ন তথ্য
পুলিশ জানিয়েছে, সিদ্ধার্থ দীর্ঘদিন স্বর্ণের কারিগর হিসেবে কাজ করতেন। তদন্তের সময় একটি চুড়ি আগুনে পরীক্ষা করার আলামত পাওয়ার পর স্বর্ণের কাজে অভিজ্ঞ কারও সম্পৃক্ততা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়।
পুলিশ কমিশনার জানান, আসামিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একটি পরিত্যক্ত স্থান থেকে কিছু স্বর্ণালংকার উদ্ধার করা হয়েছে।
তবে স্থানীয়দের দাবি, সিদ্ধার্থের কাকার বাড়ির শয়নকক্ষের পেছনে একটি নারিকেল গাছের পাশ থেকে স্বর্ণালংকারগুলো উদ্ধার করা হয়। সিদ্ধার্থের বাবাও একই দাবি করেছেন।
পুরোনো বিরোধের কথাও বলছে পরিবার
নিহত গণপতির বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী জানান, বাড়ি নির্মাণের সময় চাঁদা চাওয়াকে কেন্দ্র করে স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে গণপতির বিরোধ হয়েছিল। পরে কিছু অর্থ দিয়ে বিষয়টি মীমাংসা করা হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন।
তিনি বলেন, মামলায় অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে এবং গ্রেপ্তার দুজন ছাড়াও অন্য কেউ জড়িত ছিলেন কি না, তা তদন্তে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন।
গ্রেপ্তার মুগ্ধ দাসের মা সেনা রানী দাসও প্রশ্ন তুলেছেন, দুই যুবকের পক্ষে একসঙ্গে চারজনকে হত্যা করা সম্ভব কি না। তবে তার ছেলে অপরাধে জড়িত থাকলে আইন অনুযায়ী শাস্তি হওয়া উচিত বলেও জানান তিনি।
একইভাবে সিদ্ধার্থ দাসের বাবা কানু দাস বলেন, তার ছেলে দোষী প্রমাণিত হলে শাস্তি মেনে নেবেন। তবে হত্যাকাণ্ডে আরও কেউ জড়িত ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানান তিনি।





